ওঙ্কার ডেস্ক: বিগত কয়েকমাস ধরে মধুপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার জেরে হরমুজ প্রণালী কার্যত আলচনার মূল বিষয় হয়ে উঠেছে। হরমুজের মালিকানা নিয়েও কম জল ঘোলা হয়নি মার্কিন মুলুক এবং ইরানের মধ্যে। হরমুজ বন্ধ করার হুমকি লাগাতার দিয়ে চলেছে ইরান। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ খোলার দাবি তুলে এসেছে। যদিও কিছু দেশের জন্য শর্তস্বাপেক্ষ ছাড় দিলেও ব্যাহত হয়েছে জাহাজ চলাচল। এই সময় প্রকাশ্যে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের ঘোষণা না থাকলেও, বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে এই প্রণালী পার করানোর জন্য মার্কিন নৌবাহিনী ও সামরিক কর্তৃপক্ষ বিশেষ তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। রিপর্টে দাবি করা হয়েছে ইরানের নাকের তলা দিয়ে প্রায় ৭০টি জাহাজ পার করেছে, আর এতে সাহায্য করেছে খোদ আমেরিকা।
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। সম্প্রতি ইরান ও আমেরিকার মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক শিপিং সংস্থা এবং জাহাজ মালিক নিরাপত্তাজনিত কারণে ঝুঁকি নিতে অনীহা প্রকাশ করেছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন সেনাবাহিনী সরাসরি যুদ্ধজাহাজ দিয়ে প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজকে পাহারা না দিলেও বিশেষ নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে। উপগ্রহ, ড্রোন, সামুদ্রিক নজরদারি বিমান এবং গোয়েন্দা তথ্যের সাহায্যে জাহাজগুলিকে নিরাপদ রুট বেছে নিতে সহায়তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জাহাজের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করে সম্ভাব্য বিপজ্জনক অঞ্চল এড়িয়ে চলার নির্দেশও দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে বহু বাণিজ্যিক জাহাজকে এইভাবে নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে সাহায্য করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বিশেষ করে তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। কারণ এই ধরনের জাহাজের উপর হামলা বা বাধা সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে। রিপোর্ট অনুযায়ী জাহাজ গুলির মধ্যে থাকা ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে ওমান উপকুলের দিকে ঘেঁষে জাহাজগুলিকে নিরাপদ ভাবে পারাপার করতে সাহাজ্য করেছে মার্কিন নৌবাহিনি। যদিও কোন দেশের জাহাজ, বা কি ধরনের জাহাজ তা উল্লেখ নেই সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপের অন্যতম উদ্দেশ্য হল বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা রোধ করা। তবে একই সঙ্গে তারা সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও এড়াতে চাইছে। সেই কারণেই প্রকাশ্য সামরিক এসকর্টের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত নীরব ও কৌশলগত নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ইরান বারবার অভিযোগ করেছে যে, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলছে। ইরানের তরফে হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখার কথাও জানানো হয়েছে। ফলে এই জলপথকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতি ভারতের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলির কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে আসে এবং তার বড় অংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। রিপোর্টের দাবি অনুযায়ী লুকিয়ে পার হওয়া সেই জাহাজ গুলির মধ্যে ভারতের কোন জাহাজ ছিল কিনা তা স্পষ্ট করা হয়নি। যদিও ভারতের জন্য শর্তস্বাপেক্ষ ছাড় দিয়েছিল ইরান। অবাধেই হরমুজ পার করে দেশে এসেছে একাধিক জাহাজ। ভারতের তরফ থেকে জানানো হয়েছে দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যদিয়ে এই সিধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিছু দিন আগেই ওমান উপকূলে এক ভারতীয় জাহাজে হামলা চালায় ইরানী সেনা। সেই হামলায় কোন প্রাণহানি না হলেও জাহাজটি ডুবে গেছিল বলে জানা গেছে। ঠিক কি কারণে এই হামলা তা জানা যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতত হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বার্থে এই জলপথে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করাই এখন বিশ্বের বড় শক্তিগুলির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।