ওঙ্কার ডেস্ক: গতবছর ৮ অগস্টের রাত। টানা ৩৬ ঘণ্টা ডিউটির পর নিঃশব্দে ‘চেস্ট ডিপার্টমেন্ট’-এর সেমিনার হলে বিশ্রামে গিয়েছিলেন কলকাতার অন্যতম সরকারি মেডিক্যাল কলেজ আরজি করের ৩১ বছরের এক ডাক্তারি ছাত্রী। কিন্তু সেই বিশ্রাম আর জেগে ওঠার সুযোগ দেয়নি অমানবিকতার নির্মম হাত। পরদিন সকাল, ৯ অগস্ট, সেখান থেকেই উদ্ধার হয় তাঁর রক্তাক্ত নিথর দেহ। ময়নাতদন্তে উঠে আসে শিরদাঁড়া-শীতল করা তথ্য যৌন নির্যাতনের পর শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছিল তাঁকে।
ঘটনার শুরুতে কলকাতা পুলিশ অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করলেও পরে ধর্ষণ ও খুনের মামলা হয়। তদন্তে নেমে সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে গ্রেফতার করে পুলিশ এবং দাবি করে, তিনিই এই অপরাধের একমাত্র অভিযুক্ত। কিন্তু মৃতার পরিবার ও সহকর্মীদের অভিযোগ ছিল স্পষ্ট এটি পরিকল্পিত খুন, এবং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও কয়েকজন, যাদের অনেকেই হাসপাতালের ভেতরের লোক। সেই অভিযোগ ঘিরেই উত্তাল হয়ে ওঠে চিকিৎসক সমাজ ও সাধারণ মানুষ। দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়, জুনিয়র চিকিৎসকরা কর্মবিরতিতে নামেন, এবং আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্তভার যায় সিবিআইয়ের হাতে।
তবে সিবিআই ধর্ষণ মামলায় দ্বিতীয় কাউকে গ্রেফতার করেনি। চার্জশিটে সঞ্জয়কেই একমাত্র অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি শিয়ালদহ আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি বিতর্ক। উঠতে থাকে একের পর এক প্রশ্ন— ঘটনার পর অধ্যক্ষ কেন নিজে এফআইআর করলেন না, তাঁকে বাধা দিল কে? সেই রাতের প্রকৃত ঘটনার বিবরণ কি গোপন রাখা হয়েছে?
এই খুনের তদন্ত চলাকালীনই সামনে আসে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ দুর্নীতি এবং তদন্ত ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই সিবিআই গ্রেফতার করে আরজি করের তৎকালীন প্রিন্সিপাল সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার অফিসার ইনচার্জ অভিজিৎ মণ্ডলকে। বর্তমানে জামিনে মুক্ত অভিজিৎবাবুর মুক্তির পেছনে কেন্দ্রীয় সংস্থার বিলম্বিত চার্জশিট দাখিলই দায়ী বলে অভিযোগ উঠেছে।
এক বছর পেরিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল? একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকার সম্ভাবনা কি নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে? প্রমাণ নষ্টের দায়ে কেউ কি শাস্তি পাবে? এই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
এই অবস্থায় বিচার দাবিতে ফের পথে নেমেছে অভয়া মঞ্চ ও জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট। ৮ অগস্ট রাতে শ্যামবাজারে মশাল মিছিল, ধিক্কার সভা-সহ একাধিক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে তারা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে “এভাবে বিচার ধামাচাপা দিতে দেব না।” অন্যদিকে, বিচারহীনতার অভিযোগ তুলে শনিবার ৯ অগস্ট নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছে নাগরিক সমাজ। সেখানে উপস্থিত থাকবেন নির্যাতিতার মা-বাবাও। শুক্রবার রাতে শ্যামবাজারের বিক্ষোভে কান্নাজড়ানো গলায় তাঁদের আর্তি “আজও প্রতি রাতে মেয়ের কান্না শুনি। বিচারের জন্য যতদূর লড়তে হয়, লড়ব।”
এই লড়াই কেবল এক পরিবারের ন্যায়বিচারের জন্য নয়, বরং একটি সমাজের বিবেক জাগিয়ে রাখার জন্য যাতে আর কোনও নিরীহ প্রাণ হাসপাতালের অন্দরেই নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়।
