টলিউড বলিউড মিলিয়ে ২০২৫-এ বহু নক্ষত্রকে হারিয়েছি আমরা। বছর শেষে একবার ফিরে দেখা ‘শ্রদ্ধায়, স্মরণে’…
সহেলী বিশ্বাস

জুবিন গার্গ
সঙ্গীতশিল্পী জুবিন গার্গ। অসমীয়া, বাংলা ও হিন্দি-সহ একাধিক ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি। তিনি শুধুমাত্র একজন গায়ক ছিলেন না। ২০০০ সালের মধ্যে অসমের মানুষের অন্যতম প্রিয় শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন জুবিন। ‘গ্যাংস্টার’ ছবিতে জুবিনের কণ্ঠে ‘ইয়া আলি’ গান ছড়িয়ে পড়ে ছিল ঘরে ঘরে। তবে এত জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও মুম্বই ছেড়ে চলে আসেন অসমে। নিজের মাটির টানে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আচমকাই জানা যায়, গায়ক জুবিন গার্গ আর নেই। সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে মর্মান্তিক পরিণতি হয় গায়কের। তারপরেই একে একে উঠে আসে নানা তথ্য। গায়কের দেহ তাঁর রাজ্যে ফিরলে রাস্তায় নামে মানুষের ঢল। গোটা রাজ্য যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। তাঁর মৃত্যুর ঘটনা এখনও পর্যন্ত চলছে তদন্তাধীন। উক্ত ঘটনায় গ্রেফতারও হয়েছেন একাধিক। তবে গায়কের গান তাঁর স্মৃতি মানুষের মনে রয়ে যাবে আজীবন।

ধর্মেন্দ্র
বছরের শেষে নভেম্বরের প্রয়াত হন বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা ধর্মেন্দ্র। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে বলিউডের অবসান হয় একটি যুগের। বলিউডের ‘হি-ম্যান’ বলা হত তাঁকে। ‘পত্থর অউর ফুল’ ছবির মাধ্যমে সাফল্য আসে অভিনেতার। সেই থেকেই শুরু। এর পরে তাঁর সাফল্যের কেবল ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ছ’দশক ধরে অভিনয় জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ধর্মেন্দ্র। ৩০০টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। অমিতাভ বচ্চন, গোবিন্দা, অনীল কাপুর, হেমা মালিনী, রেখা, শর্মিলা ঠাকুরসহ নতুন পুরনো বহু অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছেন অভিনেতা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে শরীর ভাঙতে থাকে। অনেক দিন ধরেই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি, রাখা হয়েছিল ভেন্টিলেশনেও। এরই মাঝে, তাঁর মৃত্যুর খবরও ছড়ায়। সেই খবর ভুল প্রমাণ করে হাসপাতাল থেকে বাড়িও ফিরেছিলেন অভিনেতা। বাড়িতে নিয়ে এসে তাঁকে চিকিৎসার মধ্যেই রাখা হয়। আয়োজন চলছিল তাঁর ৯০তম জন্মদিন উদযাপনের, মৃত্যুকালে তাঁর ৮৯ বছর বয়স হয়েছিল। কিন্তু, তাঁর বাড়ি ফেরার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই প্রয়াত হন অভিনেতা। আগামী বছরেই মুক্তি পাবে বর্ষীয়ান অভিনেতার শেষ অভিনীত ছবি ‘ইক্কিস’।

শেফালি জরীওয়ালা
অন্যদিকে, মাত্র ৪২ বছরেই অভিনেত্রী শেফালি জরীওয়ালা দাড়ি টেনেছেন জীবনে। ২০০২ সালের ‘ইন্ডি পপ মিউজিক’ ভিডিয়ো ‘কাঁটা লাগা’ গানে ঝড় তুলেছিলেন অভিনেত্রী। শেফালির সেই সাজ-পোশাক তাঁর লুক রীতিমতো সাড়া ফেলেছিল সেই সময়। আমৃত্যু দর্শকের নজরে ওই পরিচয়েই বেঁচেছিলেন অভিনেত্রী। জুন মাসে মধ্যরাতে হৃদ্যন্ত্র বিকল হয়ে মৃত্যু হয় অভিনেত্রীর। পরে শোনা যায়, তিনি নাকি বার্ধক্যরোধক চিকিৎসা করাচ্ছিলেন। আর তার ফলেই এই আকস্মিক মৃত্যু!

আসরানী
অক্টোবর মাসে বিনোদন জগতে ছেড়ে চলে যান গোবর্ধন আসরানী। ‘শোলে’, ‘চুপকে চুপকে’, ‘মেরে আপনে’, ‘বাওয়র্চি’, ‘অভিমান’, ‘সরগম’-এর মতো নানা জনপ্রিয় ছবি রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। সত্তরের দশকে রমেশ সিপ্পির ‘শোলে’ ছবিতে অমিতাভ বচ্চন, ধর্মেন্দ্র বা আমজাদ খানের পাশাপাশি তাঁর অভিনয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এছাড়াও কৌতুক অভিনেতা হিসাবেও তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল দর্শকমহলে। তবে বার্ধক্যজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার পরে অভিনেতার মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আনে তাঁর পরিবার। সকলের আড়ালে নিরবে এক প্রকার নির্বাসন নেন অভিনেতা।

মুকুল দেব
বিনোদন জগত হারিয়েছেন আরও এক দক্ষ অভিনেতাকে। মাত্র ৫৪ বছর বয়সে মৃত্যু হয় অভিনেতা মুকুল দেবের। দীর্ঘ দিনের অভিনয়জীবন মুকুলের। সুস্মিতা সেনের বিপরীতে বলিউডে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তিনি। কিন্তু বলিউডে নায়ক হয়ে সাফল্যে যেন তাঁকে ছুতে পারেনি তেমন। পার্শ্বচরিত্রের অভিনেতা হিসাবেই রয়ে গেলেন তিনি। তাঁর এই অকাল প্রয়াণে স্তব্ধ হয়ে যান ভক্তরা। তবে তিনি অসুস্থ ছিলেন অনেক দিন ধরেই। মে মাসের শুরুতেই শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। তার পরে মৃত্যু। যদিও এক্ষেত্রে অনেকের মত, মুকুলের এই অসুস্থতার নেপথ্যে ছিল একাকিত্ব এবং অবসাদ।

পঙ্কজ ধীর
পাশাপাশি অভিনয় দুনিয়া ছেড়েছেন আরও এক জনপ্রিয় মুখ। বিআর চোপড়ার ‘মহাভারত’-এর কর্ণ চরিত্রে পঙ্কজ ধীরের অভিনয় এখনও দর্শকমনে তাজা। দীর্ঘ অভিনয় জীবনের বেশিরভাগ সময় খলচরিত্রে দর্শকের মন জিতেছেন তিনি। যদিও কেরিয়ারের শেষের দিকে এসে ইতিবাচক চরিত্রেও অভিনয় করতে দেখা গেছে তাঁকে। চলতি বছরের অক্টোবর মাসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অভিনেতা। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৬৮। দীর্ঘ দিন ধরেই ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন পঙ্কজ। চলতি বছরেই আবার তাঁর অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। শেষরক্ষা হয়নি আর।

প্রতুল মুখোপাধ্যায়
এ বছরের যেসব তারকারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম গায়ক প্রতুল মুখোপাধ্যায়। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৩। ছোট থেকেই গান লিখে তাতে সুর দেওয়ার প্রতি টান ছিল তাঁর। প্রতুল মুখোপাধ্যায়কে প্রচারের আলোয় আনে তাঁর গাওয়া ‘আমি বাংলায় গান গাই’। তাঁর গানে উঠে এসেছে মানুষের অধিকার অর্জনের লড়াইয়ের কথা। চলতি বছরে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রয়াত হন প্রতুল।

জয় বন্দ্যোপাধ্যায়
‘হীরক জয়ন্তী’, ‘মিলন তিথি’, ‘জীবন মরণ’, ‘নাগমতি’-সহ বহু ছবির নায়ক ছিলেন জয় বন্দ্যোপাধ্যায়। নব্বইয়ের দশকে বাংলা সিনেমায় তাঁর আত্মপ্রকাশ। যে সময় তাপস পাল-অভিষেক চট্টোপাধ্যায়-প্রসেনজিতেরা প্রায় প্রতিষ্ঠিত, সেই সময় আত্মপ্রকাশ জয়ের। ‘চপার’ ছবিতে তাঁর অভিনয় বিশেষ ভাবে প্রশংসিত হয়েছিল দর্শকমহলে। যদিও নিজের সাফল্য বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি। দীর্ঘ অসুস্থতার শেষে ২৫ অগাস্ট প্রয়াত হন বাংলা ছবির একসময়ের আলোচিত নায়ক জয় বন্দ্যোপাধ্যায়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২।

শ্রাবণী বণিক
বছর শেষের টলিপাড়ায়ও নেমে আসে শোকের ছায়া। না ফেরার দেশে ছোট পর্দার জনপ্রিয় মুখ অভিনেত্রী শ্রাবণী বণিক। ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন অভিনেত্রী, ভর্তি ছিলেন হাসপাতালেও। তবে আর শেষরক্ষা হল না। সোমবার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অভিনেত্রী। ‘লালকুঠি’, ‘রাঙা বউ’, ‘গোধূলি আলাপ’, ‘সোহাগ চাঁদ’-এর মতো একাধিক ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন শ্রাবণী বণিক।
কথায় আছে মানুষ চলে যায়, থেকে যায় তাঁর কাজ, তাঁর স্মৃতি। তেমনই বিনোদন জগত আজীবন এই অভিনেতা অভিনেত্রীদের অবদান কখনওই ভুলবে না। তাঁদের চরিত্র, গান, অভিনয় সারা জীবন থেকে যাবে দর্শক মনে। ওঙ্কার বাংলার পক্ষ থেকে শিল্পীদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
