মৌসুমী পাল
২০২৫ সাল বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে চিহ্নিত হয়ে থাকবে এক অস্থির, রক্তক্ষয়ী ও বহুমুখী সংঘাতের বছর হিসেবে। ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার গভীর অঞ্চলেও যুদ্ধ, বিদ্রোহ, রাষ্ট্রভাঙন ও সীমান্ত সংঘর্ষ গোটা বছরজুড়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চাপে রেখেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা, পরাশক্তিগুলির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ এই বিষয়টিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।

সিরিয়া সরকারের পতন
এই বছরের সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তনগুলির একটি ঘটে পশ্চিম এশিয়ায়, সিরিয়ায়। ২০২৪ সালের শেষের দিকে বিদ্রোহী জোট ‘হায়াত-তাহির আল-শাম’ লাগাতার আক্রমণ করতে থাকে সিরিয়ার স্বৈরাচারী শাসক পরিবার ‘আসাদ’-এর বিরুদ্ধে। ২০২৫-এর শুরুতেই ‘হায়ত তাহির আল-শাম’ সম্পূর্ণ্ভাবে বাশার আল-আসাদের দীর্ঘদিনের শাসন ভেঙ্গে দেয়। ২০২৪ এর নভেম্বর মাসে তৎকালীন সিরিয়ার শাসক বাশার আল-আসাদ মিত্রদেশ রাশিয়ায় পালাতে বাধ্য হয়। হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) এবং তাদের সহযোগী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি আলেপ্পো দখল করার মধ্য দিয়ে কার্যত সিরিয়া সরকারের পতন ঘটায়। কিন্তু আসাদ-পরবর্তী সিরিয়া শান্তির পথে হাঁটেনি। বরং ২০২৫ জুড়ে একটি দুর্বল অন্তর্বর্তী সরকার অভ্যন্তরীণ বিভাজন, কুর্দি-নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ এবং সীমান্তপারের ইজরায়েলি বিমান হামলার চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয়। রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ায় সিরিয়া আবারও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দানে পরিণত হয়। এই পরিস্থিতি গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তাকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ
দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২৫-এর সবচেয়ে বিপজ্জনক সংঘাতের সূত্রপাত হয় কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হামলার পর। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে সাধারণ পর্যটকের উপর নির্বিচারে হামলা চালায় পাকিস্তান মদতপুষ্ট জঙ্গী গোষ্টী লস্কর-ই-তৈবার একটি দল দ্য রেসিসট্যান্ট ফ্রন্ট। ২২ এপ্রিলের সেই হামলার জবাবে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে, যা ভারত-পাকিস্তানের ইতিহাসে কার্গিল যুদ্ধের পর সবচেয়ে গুরুতর সামরিক উত্তেজনায় রূপ নেয়। ভারতীয় সেনার নেতৃতাধীনে অপারেশন সিঁদুর-এ পাকিস্তানের মদতপুষ্ট নয়টি জঙ্গীঘাঁটি ধূলিসাৎ করে দেয়। এর পর ভারতের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে নামে পাকিস্তান। এই সংঘাতে দুটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ড্রোন যুদ্ধে লিপ্ত হয়। চার দিন ব্যাপী যুদ্ধের পর পাকিস্তান সেনার ডিরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি অপারেশনস ভারতের ডিজিএমও-র কাছে যুদ্ধ থামানোর অনুরোধ জানান। তারপর নয়া দিল্লিও যুদ্ধ থামানোর সিধান্ত নেয়। বিশ্ব রাজনৈতিক বাজারে দুই দেশের মধ্যকার হওয়া এই যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব নিয়ে মতবিরোধ করে চলছে। কখনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনও চিনের বিদেশ মন্ত্রী ওয়াং ই দাবি করে এসেছে তাদের মধ্যস্থতায় নাকি ভারত পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। ভারত অবশ্য এমন কোনো মন্তব্যকেই সমর্থন করেনি। নয়া দিল্লির কথায় দুই দেশ নিজেদের মধ্যেই আলোচনার মাধ্যমেই শান্তির পথ বেছে নিয়েছে। ভারত পাকিস্তানের এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ায় স্থায়ী শান্তির ধারণাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে আন্তররাজতিক রাজনৈতক মহলে।

ইরান-ইজরায়েল সংঘর্ষ
মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েল গাজা উত্তেজনার মধ্যেই সংঘর্ষে লিপ্ত হয় ইরান ও ইজরায়েল। বহু বছর ধরে ছায়াযুদ্ধ ও পরোক্ষ সংঘর্ষের পর ২০২৫ সালে এই দ্বন্দ্ব সরাসরি আন্তঃরাষ্ট্রীয় যুদ্ধে রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইজরায়েল ইরানের পরমাণু স্থাপনা ও সামরিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যা ইজরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অভূতপূর্ব চাপে ফেলে। ১২ দিনের এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে সর্বাত্মক সংঘর্ষের কিনারায় নিয়ে যায়। পরবর্তীকালে স্বয়ং মার্কিন মুলুক এই যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহন করে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশে অতি উন্নত বি-১২ যুদ্ধবিমান নিয়ে হামলা চালায় মার্কিন বায়ু সেনা। আমেরিকার সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ায় এটিকে তৃত্বীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হিসাবে দেখছিলেন বিশ্ব রাজনৈতিক মহল। শেষ পর্যন্ত কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও, এই সংঘাত গোটা অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য ও পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্নে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও রুয়ান্ডা শান্তিচুক্তি
আফ্রিকার হৃদয়ে, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও রুয়ান্ডার মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ২০২৫ সালে সাময়িক প্রশমনের পথে যায়। পূর্ব কঙ্গোর এম২৩ বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে যে সংঘর্ষ চলছিল, তা থামাতে একটি সীমিত শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যদিও এই চুক্তি যুদ্ধের তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে, বছরের শেষভাগ পর্যন্ত এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি ও প্রতিবেশী দেশের প্রভাব আফ্রিকার স্থিতিশীলতার প্রশ্নকে জটিল করে রেখেছে।

থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সংঘর্ষ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ২০২৫ সালে নতুন করে আলোচনায় আসে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের সীমান্ত সংঘর্ষ। বহু পুরনো ভূখণ্ডগত বিরোধ এই বছর ভয়াবহ রূপ নেয়। জুলাই মাসে এবং বছরের শেষদিকে দুই দেশের মধ্যে আর্টিলারি হামলা ও বিমান আক্রমণ ঘটে। জুলাই মাসে প্রথম বড়সড় সংঘাতের সূত্রপাত হয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় টহলরত বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ সামরিক লড়াইয়ে রূপ নেয়। উভয় দেশই ভারী আর্টিলারি মোতায়েন করে এবং সীমিত আকারে বিমান হামলার খবর পাওয়া যায়। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালাতে বাধ্য হয়। স্থানীয় প্রশাসন জরুরি অবস্থা জারি করে, স্কুল ও বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই সংঘাতে আসিয়ান জোটের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে আস্থার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আঞ্চলিক সংস্থাগুলির মধ্যস্থতার চেষ্টা সত্ত্বেও প্রথম দফায় সংঘর্ষ থামানো সম্ভব হয়নি।

রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘর্ষ
চলমান সংঘাতগুলির মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধরে রাখে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ২০২২ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হোয়া এই যুদ্ধ ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ গুলির মধ্যে অন্যতম। ২০২৫ সালেও এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধ, যেখানে আনুমানিক ৭৮ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। রাশিয়ার কুপিয়ানস্ক অভিমুখে আক্রমণ এবং ইউক্রেনের কুরস্ক অঞ্চলে পাল্টা হামলা যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করে। পশ্চিমা সামরিক সহায়তা ও রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এই সংঘাতকে স্থায়ী রূপ দেয়, যা ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে নড়বড়ে করে তোলে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদের জন্য ফের নিওর্বাচিত হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প আশ্বস্ত করেছিল তিনি অতিসত্তর রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন। কিন্তু একাধিক বৈঠকের পরও কোনো শান্তির পথে হাঁটতে নারাজ দুই দেশ।

ইজরায়েল ও গাজা উপত্যকা সংঘর্ষ
ইজরায়েল ও গাজা উপত্যকার সংঘর্ষও ২০২৫ সালে থামেনি। তিন মাসের যুদ্ধবিরতি সাময়িকভাবে প্রাণহানি কমালেও, মেয়াদ শেষ হতেই আবার তীব্র লড়াই শুরু হয়। বর্তমানে গাজা–ইজরায়েল পরিস্থিতি আপাতভাবে যুদ্ধবিরতির মধ্যে থাকলেও তা অত্যন্ত সংবেদনশীল। কয়েক মাসের তীব্র সংঘর্ষের পর সামরিক লড়াই কমেছে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি এখনও দূরবর্তী। গাজা উপত্যকায় মানবিক সংকট গভীর রয়ে গেছে। খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ও বিশুদ্ধ জলের তীব্র অভাব রয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর কিছু ত্রাণ পৌঁছালেও ইজরায়েলের কড়াকড়ি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার উপর বিধিনিষেধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত। অন্যদিকে, ইজরায়েল নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা বলছে এবং হামাসকে সম্পূর্ণ দুর্বল করার লক্ষ্য এখনও রাজনৈতিক সমাধানকে অনিশ্চিত করে রেখেছে।

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধও গোটা বছর জুড়ে অব্যাহত থাকে। বিদ্রোহী ও প্রতিরোধ বাহিনী ভারত ও থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করে, অন্যদিকে চীনের সমর্থনে সামরিক জান্তা দেশের কেন্দ্রীয় অংশে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। এই সংঘাত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শরণার্থী সংকট ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
