মৌসুমী পাল
২০২৫ সাল বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ বদলের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একের পর এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও শীর্ষবৈঠকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ভিত নড়বড়ে, পশ্চিমা নেতৃত্ব প্রশ্নের মুখে, আর গ্লোবাল সাউথ ক্রমশ নিজের স্বর জোরালো করছে। অর্থনীতি, নিরাপত্তা, জলবায়ু, বাণিজ্য ও কূটনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুরনো সমীকরণ ভেঙে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রধান ভূ-রাজনৈতিক সম্মেলনগুলির ধারাবাহিক পর্যালোচনায় সেই পরিবর্তনের স্পষ্ট ছাপ মিলেছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সভা
বছরের সূচনা হয় জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে। জানুয়ারির ১৯ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত চলা এই সম্মেলনে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রত্যাবর্তনই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব এই মঞ্চে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুক্ত বাণিজ্য, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং বিশ্বায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেন ইউরোপ ও এশিয়ার একাধিক নেতা। বড় কর্পোরেট সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে নতুন করে শুল্কযুদ্ধ ও জাতীয়তাবাদী অর্থনৈতিক নীতির ফলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ধাক্কা খেতে পারে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিগত বিভাজন এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেনের পুনর্বিন্যাস নিয়েও তীব্র বিতর্ক হয়।

মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স
ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত হয় মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স। ১৪ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারির এই সম্মেলনে ইউরোপের নিরাপত্তা ভবিষ্যৎ ছিল প্রধান আলোচ্য বিষয়। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক ও আর্থিক সহায়তা ধীরে ধীরে কমানোর ইঙ্গিত ইউরোপীয় দেশগুলিকে গভীর উদ্বেগে ফেলে। ‘ইউরোপীয় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ এই ধারণা নতুন করে গুরুত্ব পায়। ফ্রান্স ও জার্মানি নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় দেশগুলি নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে ন্যাটোর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। রাশিয়া ও চীনের বাড়তে থাকা প্রভাব মোকাবিলায় ইউরোপের নিজস্ব অবস্থান নির্ধারণ এই সম্মেলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় বার্তা হয়ে ওঠে।

জি-৭
জুন মাসে কানাডায় অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলন কার্যত পশ্চিমা ঐক্যের ভাঙনকে প্রকাশ্যে এনে দেয়। ১৫ থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত চলা এই বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের তরফে রাশিয়াকে ফের জি-৭-এ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব অন্যান্য সদস্য দেশগুলি সরাসরি খারিজ করে দেয়। এর ফলে দীর্ঘদিন পর জি-৭ কোনও যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়। বাণিজ্য, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীন নীতি তিন ক্ষেত্রেই বিভাজন এতটাই স্পষ্ট ছিল যে এই সম্মেলনকে অনেকেই ‘ডিসইউনিটির সামিট’ বলে আখ্যা দেন। কানাডার ভূমিকা মধ্যস্থতাকারী হলেও ঐক্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

ন্যাটো সম্মেলন
জি-৭-র ঠিক এক সপ্তাহ পর, ২৪ ও ২৫ জুন নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলন কিছুটা হলেও ঐক্যের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে। ন্যাটোর ৩২টি সদস্য দেশ ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করার লক্ষ্যে সম্মত হয়। এটি ন্যাটোর ইতিহাসে অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষী সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে আর্টিকেল ৫-এর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতিতে পুনরায় অঙ্গীকার করা হয়। তবে ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদ নিয়ে কোনও অগ্রগতি হয়নি এই বছর। বিষয়টি কার্যত স্থগিতই থাকে।

ব্রিকস সম্মেলন
জুলাই মাসে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলন ছিল গ্লোবাল সাউথের শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ। সম্প্রসারিত ‘ব্রিকস প্লাস’ জোট নিজেদের পশ্চিমা প্রযুক্তি ও আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম, উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সম্মেলনে বিশ্ববানিজ্যে ডলারে একাধিপত্যকে শেষ করার উদ্দেশ্যে ব্রিকস্ জোট ‘ব্রিকস্ কারেন্সি’ সামনে আনে। আর এতেই বেজায় চটে যায় মার্কিন মুলক। এই সম্মেলনের আর একটি নাটকীয় দিক ছিল ট্রাম্পের আমন্ত্রণ ছাড়াই ব্রাজিলে উপস্থিতি এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান মুনিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ। এই ঘটনা কূটনৈতিক মহলে নানা জল্পনা উসকে দেয় এবং দেখিয়ে দেয় যে আনুষ্ঠানিক মঞ্চের বাইরেও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন
সেপ্টেম্বরে চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত হয় সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশনের সম্মেলন। এই বৈঠকে ‘সাংহাই স্পিরিট’-এর উপর জোর দিয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাসবাদ দমন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথা বলা হয়। ন্যাটোর ইউরেশীয় প্রভাবের পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে এসসিও নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করে। চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বে এই জোট মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের রূপরেখা স্পষ্ট করে।

জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন
একই মাসে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ অধিবেশন শুরু হয়, যা চলে ৯ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই অধিবেশনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার ছিল অন্যতম প্রধান দাবি। উন্নয়নশীল দেশগুলি স্থায়ী সদস্যপদ ও ভেটো ক্ষমতার প্রশ্নে জোরালো সওয়াল করে। পাশাপাশি প্যালেস্টাইন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আবারও পশ্চিম এশিয়ার সংকটকে বিশ্বমঞ্চে ফিরিয়ে আনে। গাজা পরিস্থিতি, ইজরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব এবং মানবাধিকার প্রশ্নে তীব্র বিতর্ক হয়।

আসিয়ান সম্মেলন
অক্টোবরে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত হয় আসিয়ান ও পূর্ব এশিয়া সম্মেলন। দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা ছিল আলোচনার মূল বিষয়। আসিয়ান দেশগুলি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করার বার্তা দেয়।

কপ-৩০ জলবায়ু সম্মেলন
নভেম্বরে ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত কপ-৩০ জলবায়ু সম্মেলন বিশ্ব পরিবেশ রাজনীতিতে বড় ধাক্কা আনে। যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয়বারের জন্য প্যারিস চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়ায়। এর ফলে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হলেও চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন জলবায়ু নীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার দাবি তোলে। কার্বন নির্গমন, অর্থায়ন ও অভিযোজন তহবিল নিয়ে তীব্র আলোচনা হয়।

জি-২0
বছরের শেষ দিকে, ২২ ও ২৩ নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত হয় জি-২০ সম্মেলন। এটি ছিল আফ্রিকায় প্রথম জি-২০ সম্মেলন। যুক্তরাষ্ট্রের বয়কট সত্ত্বেও ‘জোহানেসবার্গ লিডার্স ডিক্লারেশন’ গৃহীত হয়। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের নতুন কাঠামো, উন্নয়নশীল দেশের ঋণ সমস্যা এবং গ্লোবাল সাউথের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
২০২৫ সাল বিশ্ব রাজনীতি এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বহুদিনের পরিচিত জোট ও নীতিগত ঐক্য ক্রমশ ভাঙছে, তার জায়গায় উঠে আসছে স্বার্থনির্ভর ও অঞ্চলভিত্তিক নতুন সমীকরণ। যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা অবস্থান, ইউরোপের নিরাপত্তা সংশয়, রাশিয়া ও চীনের বিকল্প মঞ্চ নির্মাণের চেষ্টা এবং গ্লোবাল সাউথের বাড়তে থাকা শক্তি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভারসাম্য নতুন করে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। আগামী বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যতেও এর প্রভাব দেখা যাবে বলে আশা রাখা যায়।
