রজত ভট্টাচার্য
আমরা যারা বাংলা সিনেমা ও গানের প্রেমে বড় হয়েছি, তাদের কাছে একটা নাম আজও কাঁপা কাঁপা আবেগ তৈরি করে, তিনি হলেন সালিল চৌধুরী। তাঁর জন্মশতবর্ষের এই বছরে আমরা শুধু একজন সুরকারকে নয়, একটি যুগকে স্মরণ করি। আজ আমি লিখতে চাই সেই মানুষটিকে, যিনি আমাদের হৃদয়ে যতটা, সুরের জগতে তার থেকেও অসীম বড়। কারণ, তিনি শুধু গান বানাননি, তিনি সময়কে সুরে বেঁধেছেন।
সলিল চৌধুরীর জন্ম ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে। ছোটবেলায় বাবার চাকরির সুবাদে আসামের চা-বাগানে বড় হওয়া। কাক-শালিকের ডাক, বনের শব্দ, বিদেশি ক্ল্যাসিকাল মিউজিক, সবই মিশে গেছে তাঁর রক্তে। খুব ছোট বয়স থেকেই তিনি ফ্লুট, পিয়ানো, এসরাজ, হারমোনিকা বাজানো নিজে নিজেই শিখে ফেলেছিলেন। তিনি ছিলেন জাতশিল্পী, সহজমানুষ, অসামান্য প্রতিভার অধিকারী। ২০ বছর বয়সে তিনি লিখেছিলেন, “কোনো এক গাঁয়ের বধূ…” যা শুধু একটি গান নয়, একটা সময়ের আর্তনাদ, একটা পৃথিবীর প্রতিবাদ। পরে যখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সেই গান গাইলেন, তখন যেন গোটা বাংলা থমকে দাঁড়াল। তারপর “রানার”, রণদা-র কবিতার আগুন হেমন্তের কণ্ঠের আগুন আর সলিলের সুর মিলে জন্ম নিল এক ইতিহাস। যা আজও শুনলে মনে হয় বুকে কেউ হাত রেখে বলছে, “দৌড়াও… হার মানো না।”
সলিল চৌধুরী ছিলেন একসঙ্গে সুরকার, গীতিকার, গল্পকার, স্ক্রিপ্টরাইটার, মিউজিক অ্যারেঞ্জার আর ছিল তাঁর বিপ্লবী মনন। তিনি শুধু বাংলা নয়, হিন্দি, মালায়ালাম, তামিল, তেলেগু সহ প্রায় ১৩টি ভাষায় কাজ করেছেন। ৭৫-এর বেশি হিন্দি সিনেমায়, ৪০-এর বেশি বাংলা সিনেমায়, ২৭টি মালায়ালম সিনেমায় তাঁর সুর আজও প্রাণবন্ত। ‘দো বিঘা জমিন’-এর কাহিনীকার ছিলেন তিনি। ‘মধুমতী’র তাঁকে কালজয়ী করে রেখেছে। ‘আনন্দ’ ছবির ‘জিন্দেগী ক্যায়সি হ্যায় পাহেলি’-র সুর তাঁকে চির স্মরণীয় করে রাখবে। তবু বলিউড কখনোই তাঁকে প্রাপ্য সম্মান দেয়নি। এত বড় বড় অবদান সত্ত্বেও তাঁকে বারবার উপেক্ষিত হতে হয়েছে। যেন সুর বাঁধা ছিল কলকাতার ট্রামের আলোয়, আর মুম্বাইয়ের গ্ল্যামার তাকে বুঝতে পারেনি। কিন্তু দক্ষিণ ভারত তাঁকে মাথায় বসিয়েছে। বিশেষ করে মালায়ালম ইন্ডাস্ট্রিতে— তিনি একটি পিলার। তার সুর ছাড়া আজও মালায়ালম ফিল্ম-ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাস অসম্পূর্ণ।
সলিল চৌধুরীর রিদম ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। পাশ্চাত্য ও ভারতীয় সঙ্গীতকে এমনভাবে মেলাতে পারতেন যে মেলোডি আর রিদম একই সঙ্গে নাচত। অনেকেই চেষ্টা করেছে, কিন্তু এখনও কেউ তাঁর স্টাইল নকল করতে পারেনি। ওই বিখ্যাত কথাটি— “He was the most complete composer India ever had.” একটুও বাড়াবাড়ি নয়।
বড় শিল্পী যেমন হন আলো, তেমনই কখনো কখনো হন বিতর্কের কেন্দ্র। সলিল চৌধুরীর জীবনেও দ্বিতীয় বিবাহের ঘটনা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে।হয়তো তিনি ভুলও করেছেন, কিন্তু নিজেকে কখনো লুকাননি। কারণ তিনি প্রথমে মানুষ, তারপর প্রতিভা। IPTA আন্দোলনে, মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে তিনি সুর তুলেছেন অস্ত্রের মতো। গান দিয়ে আন্দোলন, সুর দিয়ে বিপ্লব।
আজ শতবর্ষে আমাদের প্রশ্ন, কেন এই মানুষটি তাঁর প্রাপ্য সম্মান পেলেন না ? কেন আজকের প্রজন্ম তাঁকে পুরোপুরি জানে না ? এখন সময় এসেছে সলিল চৌধুরীকে তাঁর ন্যায্য জায়গায় ফেরানোর। “তিনি সুরের পরশ, সময়ের কবিতা, মানুষের গান।” তিনি শুধু একজন সুরকার নন—তিনি এক প্রতিষ্ঠান।
