অর্ণব দত্ত
ভারতে সন্তানসহ যুবতী বিধবারা আরেকটি বিয়ে করতে গেলে সামাজিক, পারিবারিক বাধার শিকার হচ্ছেন। অথচ যুগ বদলের হাওয়ায় পাল তুলেছেন ৬০ থেকে ৮০-এর বৃদ্ধারা। সমাজের নাগপাশ ভেঙে তাঁরা বিয়ে করছেন, কিংবা লিভ ইন-এও বিরাগ দেখাচ্ছে না। তাহলে কী অল্প বয়েসিদের চেয়ে বৃদ্ধ বৃদ্ধারা অনেক বেশি সাহসী ? এ প্রসঙ্গে আসছি। তার আগে একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক।
মানবতার প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বকালে প্রাসঙ্গিক। একথা রবিঠাকুরের বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও টের পাননি। দাদাদের প্রেরণায় কাব্যচর্চা করতে করতেই একদিন ঘটল এক বিস্ময়কর কাণ্ড। কৈশোরের রবি ঠাকুর খুঁজে পেলেন তাঁর নিজস্ব বাংলা ভাষা। এরপর লাগাতার কবিতা লেখা এবং একের পর এক বই ব্রাহ্ম সমাজের প্রেস থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করলেও সেকালে কেউ কিনছিলেন না রবিঠাকুরের কাব্যগ্রন্থগুলি। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথও ছেলের প্রতি তখন বিরক্ত। তিনি বলেছিলেন, ‘ব্রাহ্ম সমাজের প্রেস রবির বই যেন আর না ছাপে। কেননা এতে প্রেসের আর্থিক লোকসান হচ্ছে।’ তবে কবির দাদাদের পাশাপাশি বৌদি কাদম্বরী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুরাগী।
যাইহোক, রবিঠাকুর মহাবিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন পিতৃআদেশে। এদিকে জাতে কবি তিনি। এরপর বিস্ময়কর কাণ্ড ঘটল। তা হল গুদামে কবির ডাঁই করে পড়ে থাকা বইগুলি সব একলপ্তে কিনে নিলেন একজন প্রকাশক। এজন্যে রবিঠাকুর পেলেন যথেষ্ট টাকাপয়সা। আর বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়ালেন নতুন বউয়ের হাতের রান্না।
সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম এবং একমাত্র ভারতীয় সাহিত্যক যিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়ে স্মরণীয়, বরণীয় বিশ্বকবির শিরোপা পেলেন। একেই সম্ভবত বলে অদৃষ্টের পরিহাস ! ধান ভানতে শিবের গীত না করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের একটি গানের এককলি বর্তমানে ভারতে প্রবীণা কিংবা বৃদ্ধা বিধবাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক। সেই গানটি হল ‘দিন যায়, রাত যায়, সব যায় – আমি বসে হায় !’
রবীন্দ্র পরবর্তী যুগে আধুনিক কবিদের কেউ বলেছেন, ‘একা হও, এক হও।‘ এদিকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘সহে না যাতনা, সখা হে, এলে না। ‘বাংলা ভাষাকে আধুনিক করে তোলার রূপকার রবীন্দ্রনাথ সঠিক নাকি ‘একা হও, হও’ বলে আধুনিক কবি যে কাব্য করেছেন তিনি বেঠিক, এনিয়ে তর্ক করলে বিশ্বাসে না মিলাবে বস্তু, উপরন্তু বাাপারটা তর্কে বহুদূর যাবে, তাতে হারিয়ে যাবে খেই।
অতীত পেরিয়ে যে বর্তমানে আছি, এযুগে ‘সঙ্গ নিঃসঙ্গতা’ বাজারে তেমন কাটছে না। বরং বহু বৃদ্ধা বিধবা মহিলা খুঁজছেন এমন কোনও পুরুষসঙ্গী, যিনি একাকীত্বের হাত থেকে তাঁকে মুক্তি দেবেন। ২০২৭ সালের সেনসাসের ফলাফল বেরোলে জানা যাবে, ভারতে নাবালিকা, সাবালিকা এবং বৃদ্ধা বিধবার সংখ্যা্ ঠিক কত। সর্বশেষ সমীক্ষার ফলাফল অনুসারে, ভারতে প্রায় ৫ কোটির ৬ লক্ষ বিধবা নাগরিক রয়েছেন। এঁদের ৫৮ শতাংশ বৃদ্ধা ৬০ বছর কিংবা তার চেয়ে বেশি বয়স্ক। দুটি খবর বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে। প্রথম খবরটি হল ৪০ বছরের কমবয়স্ক বিধবা যাঁদের সন্তান রয়েছে, নানা সামাজিক বাধায় ইচ্ছা সত্ত্বেও তাঁরা দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে পারছেন না। এসম্পর্কে ইতিমধ্যে যে স্টা়ডিগুলো হয়ে্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, যুবতী বিধবারা বিয়ে করতে পারছেন না ভারতীয় সমাজের রক্ষণশীলতার কারণে। বিশেষত, হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তর্গত বিধবারা। তবে মুসলমান ভারতীয় নাগরিকদের ক্ষেত্রে বিধবা বিবাহ ইসলাম অনুমোদিত।
নতুন স্টাডিগুলির ফলাফল অনুসারে, অনেক ক্ষেত্রে হিন্দু যুবতী বিধবারা বিয়ে করতে পারছেন না পরিবারের সদস্যদের বাধার কারণে। অন্যদিকে, প্রবীণ নাগরিক বিধবাদের মালাবদলের হারও ন্যূনতম। প্রায় ধর্তব্যের মধ্যেই নয়।
আরেকটি নতুন খবর জানা গিয়েছে। খবরটি হল এই, একাকীত্বের যাতনা কাটাতে ভারতীয় সমাজে ৬০ থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধারা এবার পথ দেখাচ্ছেন। অত্যন্ত সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে ওঁরা নিয়ম ভাঙার খেলায় নাম লিখিয়েছেন।
এদেশের ম্যাট্রিমোনিয়াল পোর্টাল এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সূত্রের খবর, প্রবীণা এই বিধবারা তিনটি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। প্রথমত, তাঁরা ফের বিয়ে করতে আগ্রহী। দ্বিতীয়ত, এঁদের একাংশ লি|ভ-ইন-রিলেশনে যুক্ত হচ্ছেন। তৃতীয়ত, পুরুষ সঙ্গীর সন্ধানে আবেদন জানাচ্ছেন।
আসলে অভিভাবকরা পথ দেখান। এক্ষেত্রেও ৬০ থেকে ৮০ বছরের যে বিধবা মহিলারা এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা ভারতীয় সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতাকে শিকলমুক্ত করতে ভবি|ষ্যতের যুবতী বিধবাদের বিয়ে করতে সাহস এবং অনুপ্রেরণা জোগাবে, একথা অস্বীকার করার নয়।
৬০ থেকে ৮০ বছরের বিধবারা ক্রমবর্ধমান হারে একজন সঙ্গীর সন্ধান করছেন খুল্লামখুল্লাভাবে, এই সাহসী পদক্ষেপ সন্তান আছে এমন যুবতী বিধবাদের আরেকবার বিয়ের বা লিভ ইন সম্পর্কের বাধা কাটাতে নজির হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখাবে। প্রবীণ নাগরিক বিধবাদের অনেকেই একাকী থাকার যাতনা কাটাতে সখার সন্ধানে উন্মুখ, এটা আধুনিকতার নমুনা। ধর্মাচারণ যেমন ব্যক্তিগত, জীবনও তাই। এতে হস্তক্ষেপ করা মান্ধাতার আমলের মানসিকতার সমতুল।