ওঙ্কার ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের ডিএ আন্দোলনের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তেমনই নারীকল্যাণ, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য একাধিক বড় প্রকল্প ও আর্থিক বরাদ্দের ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বিধানসভায় বাজেট পেশ করে জানান, চলতি আর্থিক বছরের বাকি আট মাসে উন্নয়নমূলক কাজের জন্য অতিরিক্ত ৪০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ উন্নয়ন প্যাকেজ নেওয়া হচ্ছে।
বাজেটের সবচেয়ে বড় ঘোষণাগুলির মধ্যে রয়েছে রাজ্য সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের জন্য ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) বৃদ্ধি। দীর্ঘদিন ধরে ডিএ-র দাবিতে আন্দোলন চলার পর এই সিদ্ধান্তকে সরকারের বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের দাবি, এর ফলে লক্ষাধিক কর্মচারী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি সরাসরি উপকৃত হবেন।
নারীকল্যাণে সরকারের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এই প্রকল্পের আওতায় যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পরিবর্তে চালু হওয়া এই প্রকল্পকে বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যেও একাধিক পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। যুবসমাজের জন্য বিশেষ কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে জোর দেওয়া হয়েছে। শিল্প বিনিয়োগ টানতে নতুন শিল্পনীতি, শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে আর্থিক সহায়তার রূপরেখা বাজেটে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, আগামী কয়েক বছরে লক্ষাধিক নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগোনো হবে।
কৃষি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা করা হয়েছে। কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, ফসল সঙ্গরক্ষণ এবং কৃষিজাত পণ্যের বিপণনের জন্য পৃথক প্রকল্প গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কৃষি ও সহযোগী ক্ষেত্রের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৪ হাজার ৩১২ কোটি টাকারও বেশি। পাশাপাশি সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা।
স্বাস্থ্য খাতেও বড় বিনিয়োগের ঘোষণা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ২৩ হাজার ১১৯ কোটি টাকার বেশি। জেলা হাসপাতাল উন্নয়ন, নতুন চিকিৎসা পরিকাঠামো গড়ে তোলা, গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্প্রসারণ এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য এই অর্থ ব্যয় করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও যুবকল্যাণ মিলিয়ে বরাদ্দ করা হয়েছে ৫১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকারও বেশি। মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য বৃত্তি, উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। গ্রামীণ রাস্তা, পানীয় জল, আবাসন, পঞ্চায়েত পরিকাঠামো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার প্রকল্পগুলিতে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। অন্যদিকে শহরাঞ্চলের উন্নয়ন, জল সরবরাহ, নিকাশি, আবাসন ও নগর পরিকাঠামোর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা।
পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৪ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকার বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন সড়ক, সেতু, পরিবহণ অবকাঠামো এবং বিমানবন্দর সংযোগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন বিমানবন্দর উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি ‘এয়ারপোর্ট মাস্টারপ্ল্যান’ বাস্তবায়নের জন্যও প্রাথমিক আর্থিক রূপরেখা বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে।
শিল্প ও খনিজ সম্পদ খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। নতুন শিল্পপার্ক, উৎপাদন কেন্দ্র, লজিস্টিক হাব এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে রাজ্যে শিল্পায়নের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে ৫ হাজার ৩৭২ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দের ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে শিল্প ও সাধারণ মানুষের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পরিষেবা নিশ্চিত করা যায়।
তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির কল্যাণে বরাদ্দ করা হয়েছে ৬ হাজার ৯১৫ কোটি টাকারও বেশি। সামাজিক সুরক্ষা, পুষ্টি ও কল্যাণমূলক কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫১ হাজার ৮১৫ কোটি টাকার বেশি। সরকারের দাবি, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশকে মূলস্রোতে আনার লক্ষ্যেই এই বরাদ্দ করা হয়েছে।
বাজেট পেশের পর সরকার দাবি করেছে, এই আর্থিক পরিকল্পনা একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে, তেমনই কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিকাঠামো ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে রাজ্যের অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে।