ওঙ্কার ডেস্ক: হালিশহরে পুলিশি হেফাজতে তৃণমূল কর্মীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পরিবারের সঙ্গে দেখা করে একাধিক আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন তিনি। নিহতের স্ত্রীকে সরকারি চাকরি দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকার আর্থিক সাহায্য এবং দুই সন্তানের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসনিক স্তরে কড়া পদক্ষেপের কথাও জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, এই হালিশহরে দলের কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে দেখেই জনতা মারমুখী হয়ে ওঠে। গাড়িতে কাদা ছুঁড়ে চর চোর স্লোগান তোলা হয়।
জানা গিয়েছে, মৃত বিরজু কেওট তৃণমূলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। একটি মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করার পর পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছিল। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। হেফাজতে থাকাকালীন তাঁর উপর শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছিল বলে পরিবারের তরফে অভিযোগ ওঠে। এমনকি তাঁকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধর করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই হালিশহর ও কাঁচরাপাড়া এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। বিরজুর মৃত্যুকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া।
এই পরিস্থিতিতেই নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের অভিযোগ ও সমস্যার কথা শোনেন তিনি। পরিবারের আর্থিক ভবিষ্যৎ এবং সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়েও আলোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। এরপরই একাধিক সাহায্যের ঘোষণা করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিরজু কেওটের স্ত্রীকে সরকারি চাকরি দেওয়া হবে। তাঁকে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের অধীনে অ্যাটেনডেন্ট পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানানো হয়। এই পদে মাসিক ১৫ হাজার টাকা বেতন পাওয়ার কথা রয়েছে। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তাঁকে গ্রুপ-ডি পদে স্থায়ী করার ব্যবস্থাও করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পর যাতে পরিবারটি সম্পূর্ণভাবে আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে না পড়ে, সেই লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী রিলিফ ফান্ড থেকে এই অর্থ দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। মৃত বিরজু কেওটের দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁদের পড়াশোনায় যাতে কোনও বাধা না আসে, সে বিষয়টি প্রশাসন দেখবে বলে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও কড়া পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। ঘটনার তদন্তকারী আধিকারিককে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট থানার আইসি-কে ক্লোজ করার কথাও জানানো হয়েছে। পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় কীভাবে বিরজুর মৃত্যু হল এবং তাঁর সঙ্গে কোনও ধরনের নির্যাতন করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, শুধু পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত নয়, গোটা ঘটনার বিষয়ে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়েও তদন্ত হবে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মৃত্যুর আগে তাঁর শারীরিক অবস্থার কী ছিল, হেফাজতে তাঁর সঙ্গে কী আচরণ করা হয়েছিল এবং মৃত্যুর পিছনে কোনও নির্যাতন বা গাফিলতি ছিল কি না সবকিছুই তদন্তের আওতায় আনা হবে।
রবিবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মৃত তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে হালিশহরে গিয়েছিলেন। সেই সফরকে কেন্দ্র করে এলাকায় বিক্ষোভ ও উত্তেজনার পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে অভিযোগ। তাঁর কনভয়কে লক্ষ্য করে কাদা, পাথর ও জুতো ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে ‘চোর চোর’ শ্লোগান তোলে বিক্ষুব্ধ জনতা। এই ঘটনার পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি। মমতা জানান এই হামলায় তাঁর মাথা ফেটে যেতে পারত, গুরতর আহত হতে পারতেন তিনি। তৃণমূল সুপ্রিমোর উপর এই হামলায় সরব হয়েছেন দলের কর্মীরা। কুলান ঘোষ রাজ্যের শাসক দলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “রাজ্যে জঙ্গল রাজ চলছে”। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় অভিযোগ আনেন, পুরো ঘটনাটি পুলিশের সামনে ঘটে এবং স্থানীয় আইসির মদতেই নাকি পুরো হামলাটি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিজেপি নেতৃত্ব এই সব অভিযোগ খারিজ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, “চুরি করলে চোর ডাক শুন্তেই হবে”। পাশাপাশি তিনি এই হামলার নেপথ্যে বিজেপির যোগসূত্র একেবারে নাকচ করেছেন। পাশাপাশি পুর ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানান, “কোন ধরনের হামলা বিজেপি সমর্থন করেনা”। কেউ বা কারা দলের নাম নিয়ে অশান্তির সৃষ্টি করে তাঁকে কোন ভাবেই রেয়াত করা হবেনা বলেও জানান তিনি।