ওঙ্কার ডেস্ক: দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপিকা দেবস্মিতা পাল খুনের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর মোড় এল তদন্তে। ঘটনার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলা থেকে এক দম্পতিকে গ্রেফতার করেছে দিল্লি পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, দীর্ঘদিনের সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া দম্পতি দেবস্মিতার পৈতৃক বাড়ির ভাড়াটে ছিলেন এবং সেই সম্পত্তির দখল নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল বলে জানা গিয়েছে।
চলতি সপ্তাহে শুক্রবার পূর্ব দিল্লির বসুন্ধরা এনক্লেভ এলাকার একটি বহুতলের সপ্তম তলায় নিজের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় দেবস্মিতা পালের রক্তাক্ত দেহ। দীর্ঘ সময় ফোনে যোগাযোগ না হওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁর দিদি ফ্ল্যাটে পৌঁছন। দরজায় সাড়া না পেয়ে শেষ পর্যন্ত দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকতেই মেঝেতে পড়ে থাকা দেবস্মিতার নিথর দেহ দেখতে পান তিনি। ঘটনাস্থলের দৃশ্য দেখে প্রথম থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের দাগও নজরে আসে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দিল্লি পুলিশ ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের দল। প্রাথমিক তদন্তে দেখা যায়, ফ্ল্যাট থেকে কোনও মূল্যবান সামগ্রী, নগদ অর্থ বা গয়না খোয়া যায়নি। ফলে চুরি বা ডাকাতির তত্ত্ব দ্রুতই খারিজ হয়ে যায়। তদন্তকারীদের সন্দেহ হয়, খুনের পিছনে ব্যক্তিগত শত্রুতা অথবা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র রয়েছে। তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে আবাসনের সিসিটিভি ফুটেজ। সেখানে দেখা যায়, ঘটনার দিন এক পুরুষ ও এক মহিলা মুখ ঢেকে ভবনে প্রবেশ করেন। তাঁরা সরাসরি দেবস্মিতার ফ্ল্যাটে যান এবং প্রায় আধ ঘণ্টারও বেশি সময় সেখানে অবস্থান করেন। পরে পোশাক পরিবর্তন করে ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায় তাঁদের। এই আচরণ তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ তাঁদের গতিবিধি অনুসরণ করতে শুরু করে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্তদের খোঁজে একাধিক রাজ্যে তল্লাশি চালানো হয়। তদন্তকারী দল শতাধিক মানুষের গতিবিধি খতিয়ে দেখে এবং সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের তালিকা তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রযুক্তিগত তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য সূত্রের ভিত্তিতে পূর্ব বর্ধমানে পৌঁছয় পুলিশ। সেখান থেকেই গ্রেফতার করা হয় অভিযুক্ত দম্পতিকে। জেরায় উঠে এসেছে, দেবস্মিতার পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। ওই দম্পতি যে বাড়িতে ভাড়াটে হিসেবে থাকতেন, সেটি খালি করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন দেবস্মিতা। তদন্তকারীদের অনুমান, সম্পত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার উদ্দেশ্যেই এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। খুনের আগে থেকেই পরিকল্পনা করে দিল্লিতে পৌঁছেছিলেন অভিযুক্তরা বলে মনে করা হচ্ছে। ঘটনার পর দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান তাঁরা।
দেবস্মিতা পাল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ শিবাজী কলেজের অধ্যাপিকা ছিলেন। পড়াশোনা ও গবেষণার জগতে তিনি অত্যন্ত পরিচিত মুখ ছিলেন। সহকর্মী এবং ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি ছিলেন জনপ্রিয় শিক্ষিকা। তাঁর আকস্মিক ও নৃশংস মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকেই এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছেন।
বর্তমানে ধৃত দম্পতিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার আরও বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। খুনের পরিকল্পনায় অন্য কারও ভূমিকা ছিল কি না, কিংবা এর পিছনে আরও কোনও আর্থিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, সমস্ত তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে শীঘ্রই আদালতে পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট পেশ করা হবে। দিল্লির এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখন সেই দিকেই এগোচ্ছে।