নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ ২৪ পরগণা: ১৭ শ্রাবণ জীবনাবসান ঘটে গাজী বাবা বা গাজী সাহেবের। যিনি সুন্দরবনের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভয়াবহ খরা, মানুষের দুর্দশা দেখে কঠোর সাধনায় বসেন। জনশ্রুতি বলে, তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাবে আকাশে নামে বৃষ্টি, প্রাণ ফিরে পায় খরাপীড়িত জনপদ। কিন্তু সেই সাধনার চরম মূল্য দিতে হয় জীবনদানের মধ্যে দিয়ে। তাই সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই প্রতি বছর দক্ষিণ ২৪ পরগনার ঘুটিয়ারী শরীফে বসে গাজী বাবার ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক মেলা—যেখানে ধর্মের বিভাজন নয়, মানুষের বিশ্বাস ও সম্প্রীতিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় পরিচয়। লোকমুখে প্রচলিত, আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে সুন্দরবনের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভয়াবহ খরার কবলে পড়েছিল। মাঠে ফসল ছিল না, পুকুর-খাল শুকিয়ে গিয়েছিল, পানীয় জলের সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন মানুষ। সেই সময় মানবপ্রেমিক সুফি সাধক পীর মোবারক গাজী, যিনি গাজী বাবা বা গাজী সাহেব নামে পরিচিত, মানুষের দুর্দশা দেখে কঠোর সাধনায় বসেন। জনশ্রুতি বলে, তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাবে আকাশে নামে বৃষ্টি, প্রাণ ফিরে পায় খরাপীড়িত জনপদ। কিন্তু সেই সাধনার চরম মূল্য দিতে হয় তাঁকেই। বিশ্বাস করা হয়, ১৭ শ্রাবণ তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তাই সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই প্রতি বছর দক্ষিণ ২৪ পরগনার ঘুটিয়ারী শরীফে বসে গাজী বাবার ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক মেলা—যেখানে ধর্মের বিভাজন নয়, মানুষের বিশ্বাস ও সম্প্রীতিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় পরিচয়। সোমবার ১৭ শ্রাবণ উপলক্ষে ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুটিয়ারী শরীফ দরগা চত্বরে নেমে আসে মানুষের ঢল। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে হাজার হাজার ভক্ত, দর্শনার্থী ও পর্যটক এখানে উপস্থিত হন। হিন্দু, মুসলিম-সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ গাজী বাবার মাজারে চাদর, ফুল, গোলাপজল ও মিষ্টি নিবেদন করে শান্তি, সুস্বাস্থ্য, সংসারের মঙ্গল এবং মনোবাসনা পূরণের প্রার্থনা করেন। ভক্তদের দীর্ঘ সারি, দরগা চত্বরে প্রার্থনার আবহ এবং চারপাশে উৎসবের আমেজ মিলিয়ে এক অনন্য পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
শতাব্দীপ্রাচীন এই মেলাকে ঘিরে সকাল থেকেই মুখর হয়ে ওঠে গোটা ঘুটিয়ারী শরীফ। মেলা প্রাঙ্গণে বসেছে শতাধিক অস্থায়ী দোকান। খেলনা, পোশাক, গৃহস্থালির সামগ্রী, ধর্মীয় উপকরণ, মিষ্টি, স্থানীয় খাবার এবং নানা ধরনের সামগ্রীর দোকানে উপচে পড়া ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, দোলনা ও বিভিন্ন বিনোদনের আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই রঙিন আলোকসজ্জায় সেজে ওঠে গোটা এলাকা। আলো, মানুষের কোলাহল এবং প্রার্থনার সুরে এক অন্যরকম আবহ তৈরি হয়। মেলায় আসা ভক্ত মমতাজ বিবি বলেন, “আমাদের বাড়ি এখানেই। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, ১৭ শ্রাবণে হাজার হাজার মানুষ গাজী বাবার দরবারে আসেন। এখানে হিন্দু-মুসলিম সবাই একসঙ্গে প্রার্থনা করেন। গত বছরের তুলনায় এবার মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তবে একটি সমস্যাও রয়েছে। এখানে আসার রাস্তাঘাট অত্যন্ত বেহাল। রাজ্য সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, রাস্তা সংস্কার করা হলে দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের যাতায়াত অনেক সহজ হবে এবং এলাকার মানুষও উপকৃত হবেন।” আর এক ভক্ত আকতার আলী বলেন, “গাজী বাবার দরগার সঙ্গে মানুষের বিশ্বাস গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। দরগার ভেতরে একটি পুকুর আছে। অনেকেই সেখানে মানত করেন। বিশ্বাস করা হয়, গাজী বাবার আশীর্বাদে মনোবাসনা পূর্ণ হলে ভক্তরা আবার এসে সেই মানত পূরণ করেন। এই বিশ্বাসই প্রতি বছর লাখো মানুষকে এখানে টেনে নিয়ে আসে।” স্থানীয় ব্যবসায়ী আকিব দেওয়ান জানান, “গাজী বাবার এই বার্ষিক উৎসব শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি এলাকার অর্থনীতিরও বড় ভরসা। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন। তাঁরা দরগায় চাদর, ফুল ও মিষ্টি নিবেদন করার পাশাপাশি মেলা থেকেও কেনাকাটা করেন। এই এক মাসের মেলাকে ঘিরে বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারের ভালো আয় হয়।” ঘুটিয়ারী শরীফে বছরে দুটি বড় ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমটি আষাঢ় মাসের ৭ তারিখ অম্বুবাচী উপলক্ষে পালিত ‘ফাতেয়া’ উৎসব। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই উৎসবের সূচনা করেছিলেন রাজা মদন রায়। সেই সময় থেকে হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ পীরের উদ্দেশ্যে শিরণি, গোলাপজল ও মোমবাতি নিবেদন করে আসছেন। বারুইপুরের রায়চৌধুরী পরিবারের দেওয়া শিরণি দিয়ে এই উৎসবের সূচনা করার ঐতিহ্যও আজও বজায় রয়েছে। দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় ১৭ শ্রাবণে, গাজী বাবার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে। প্রতিবছর এই দিন থেকে শুরু হওয়া মেলা প্রায় এক মাস ধরে চলে। স্থানীয়দের দাবি, এই সময়ে চার থেকে পাঁচ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়। ফলে ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এই মেলার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
এদিনকে উপলক্ষ্য করে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নিরাপত্তায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মেলা চত্বরে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ, ট্রাফিক কর্মী, সিভিল ডিফেন্স ও স্বেচ্ছাসেবক। ভিড় নিয়ন্ত্রণ, যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে একাধিক নজরদারি ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসা শিবির, পানীয় জল এবং জরুরি পরিষেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের কোনও অসুবিধা না হয়। লোকমুখে আরও প্রচলিত রয়েছে, ক্যানিং থানার পূর্বতন বাঁশরা অঞ্চলে বসবাস করতেন ঐশীশক্তিধর ফকির ও মানবপ্রেমিক পীর মোবারক গাজী। তাঁর সমাধিস্থল, মসজিদ এবং ওয়াকফ বোর্ড পরিচালিত ধর্মীয় পরিসরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বর্তমান ঘুটিয়ারী শরীফ দরগাহ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই পবিত্র স্থান সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে রয়েছে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়েও ঘুটিয়ারী শরীফের গাজী বাবার মেলা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি বাংলার লোকঐতিহ্য, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানুষের অটুট বিশ্বাসের এক জীবন্ত দলিল। ধর্মের বিভাজনকে পিছনে ফেলে একসঙ্গে প্রার্থনা, মানত ও শুভকামনায় অংশ নেওয়া লাখো মানুষের উপস্থিতি যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়—বিশ্বাসের কোনও ধর্ম হয় না, মানবতাই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।