অসীম সেন
পর্ব-২
অসীমঃ সামনের সপ্তাহে মূর্তিটি ন্যাশনাল মিউজিয়ামের হাতে তুলে দেওয়ার কথা। দিল্লি থেকে সেন্ট্রাল মিনিস্টারের আসছেন। সবকিছু রেডি। কার্ড ছাপানো হয়ে গিয়েছে। এখন এই কাণ্ড।
পফেসর বাগচিঃ তা আমার কাছে তুমি কী করতে এসেছো?
অসীমঃ আপনার কাছে মানে…. আমি এসেছি দিদির কাছে।
প্রফেসর বাগচিঃ মানে!! দূর হ শালা। দিদির কাছে আসা হয়েছে ?
সমিতাঃ আরে ঠিক আছে। ও তোমার কাছেই এসেছে। তা অসীম একবার ত্রিপাঠীজির বাড়িতে গেলে হয় না ?
অসীমঃ যাবে ? আরে তোমরা গেলে তো ভালোই হয়। লালবাজারে আমার সিনিয়র পর্যন্ত তোমাদের কথা বলছিলেন। মুরারিপুকুর ডাকাতি মামলাটা যেভাবে সলভ করেছিলে ও ফ্যান্টাস্টিক।
প্রফেসার বাগচিঃ আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হবে না। আমার কাজ আছে।
সমিতাঃ আরে তুমি না গেলে কেস সলভ করবে কে ?
প্রফেসার বাগচিঃ সে কথা কি আর সবার মনে থাকে ?
অসীমঃ আরে জামাইবাবু আপনি তো ব্যোমকেশ বক্সি। চলুন চলুন। ফেরার পথে আর্সেলানের বিরিয়ানি পাক্কা।
বিরাটির নীলাচল পেরিয়ে এস ত্রিপাঠীর বাড়ি। বাড়ির বয়স নয় নয় করে আশি থেকে একশ। এখানে তিন পুরুষের বাস ত্রিপাঠীদের। বিশাল বাড়ি। আদবকায়দায়ই আলাদা। বসার ঘরে একটা বাঘের ছাল। পূর্বপুরুষদের কীর্তি বোধহয়। বেশিক্ষণ বসতে হল না। ওপর থেকে খুড়িয়ে খুড়িয়ে লাঠি হাতে নামলেন এস ত্রিপাঠী।
ত্রিপাঠীঃ অফিসার বুদ্ধ মূর্তিটার হিস্টোরিক্যাল ভ্যালু বিশাল। যদি ওটা দেশ থেকে বেরিয়ে যায়….
প্রফেসর বাগচিঃ মূর্তিটা থাকত কোথায়
ত্রিপাঠীঃ আপনি?
অসীমঃ ইনি প্রফেসার বাগচি আর ইনি সমিতা বাগচি। এনারা দুজনেই প্রফেসার। কিন্তু লালবাজারে যথেষ্ট পরিচিত মুখ। এনারা আমার সঙ্গে এসেছেন কেসটায় ইন্টারেস্ট নিয়ে।
প্রফেসর বাগচিঃ নমস্কার মিষ্টার ত্রিপাঠী। আপনার পায়ে কী হয়েছে ? রীতিমত খোড়াচ্ছেন।
ত্রিপাঠীঃ রবিবার মর্নিং ওয়াকে গিয়ে পায়ে চোট লেগেছে। ডাক্তার রেস্ট নিতে বলেছেন। আমার কথা বাদ দিন, আপনারা পারবেন আমার মূর্তিটা উদ্ধার করে দিতে। দিস ইস এ ওয়ার্ক অফ আর্ট।
প্রফেসার বাগচিঃ সেটা তো গোটা কেসটা না শুনে বলতে পারব না।
ত্রিপাঠীঃ পুরোটা আমিও জানি না। কাশ্মীর একটা সময়ে সম্রাট অশোকের অধীনে ছিল। তিনিই শ্রীনগরের প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় থেকেই কাশ্মীরে বৌদ্ধ ধর্ম ছড়িয়ে পড়ে। খ্রিষ্টিয় সপ্তম শতাব্দীতে দুর্লভবর্ধন কাশ্মীরে কারকোটা নামে একটা রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ধর্মকীর্তির সঙ্গে একবার বৌদ্ধ দর্শন আলোচনায় খুশি হয়ে দুর্লভবর্ধন এই মূর্তিটি ধর্মকীর্তিকে উপহার দেন। এরপর বহু হাত ঘুরে এই মূর্তি আমার পরিবারে আসে। মূর্তিটির সঙ্গে একটা পুঁথি রয়েছে। যে পুঁথি মূর্তির ইতিহাস বলে। পুঁথির সত্যতা বোঝার কোনও উপায় নেই। তবে মূর্তিটি যে হাজার বছরের প্রাচীন তা নিশ্চিত।
সমিতাঃ কিন্তু মূর্তিটা চুরি গেল কীভাবে?
ত্রিপাঠীঃ শনিবার রাতে আমি খাটু শ্যামবাবার মন্দির থেকে একটু রাত করে ফিরেছিলাম। ইদানিং রাতে ঘুম হয় না। ঘুমের ওষুধ খেতে হয়। আমার আবার দীর্ঘদিনের মর্নিংওয়াকের অভ্যাস। সকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে যাই। ফিরে এসে দেখি দেরাজ খোলা। বুদ্ধ মূর্তি নেই।
অসীমঃ অত দামী মূর্তটা ঘরে রেখেছিলেন!
ত্রিপাঠীঃ না ওটা সাধারণত ব্যাঙ্কের লকারে থাকে। সাত দিন বাদে ওটা মিউজিয়ামে দিয়ে দেব। তাই কয়েকদিনের জন্য নিজের কাছে এনে রেখেছিলাম।
প্রফেসর বাগচিঃ অত দামী মূর্তি! ইনসুয়োরেন্স করা ছিল নিশ্চই।
ত্রিপাঠীঃ তা ছিল। তবে টাকার কথা ভাবছি না। এটা আমাদের ফ্যামিলি প্রেস্টিজ। আপনারা যে ভাবে হোক মূর্তিটাকে খুঁজে বের করুন। যত টাকা লাগে আমি দেব।
প্রফেসর বাগচিঃ একবার আপনার দেরাজটা দেখা যায়
ত্রিপাঠীঃ নিশ্চই।
দোতলায় ত্রিপাঠীজির শোবার ঘরেই দেরাজ। দেরাজ না বলে সিন্দুক বলাই ভালো। গোটা ঘরটাকে একবার জরিপ করে নিলেন প্রফেসর বাগচি। দরজা দিয়ে ঢুকে ডান দিকে রয়েছে দেরাজটা। পুরানো বাড়ি দেওয়াল গুলি বেশ মোটা। দেরাজের ওপর রুপোর লক্ষ্মী গণেশের মূর্তি। প্রতিদিন পুজো হয়। দরজার পাশে একটা ব্রোঞ্জের রোমান সৈনিকের মূর্তি। ঘরের পূর্ব দিকে একটা আলমারি। সেটার বয়সও নেহাত কম হবে না। দক্ষিণে একটা বিরাট জানালা। স্লাইডিং পাল্লাটা নতুন। এরমধ্যেই বসানো হয়েছে। জানলার ওপাশে সাজানো বাগান। ত্রিপাঠীর শখ আছে বলতে হবে। থরে থরে মরশুমি ফুলের টব। দু মানুষ উঁচু পাঁচিলের ধার ঘেসে সার বেধে দেবদারু। জানলার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ হাত ঝাড়েন প্রফেসর বাগচি।
প্রফেসর বাগচিঃ দেখেছ কাণ্ড এখানে রীতিমত পিঁপড়ে বাসা বেধেছে।
ত্রিপাঠীঃ পিঁপড়ে? পিঁপড়ে এখানে এল কী করে?
সমিতাঃ দেরাজটা তালা দেওয়া ছিল না?
ত্রিপাঠীঃ কী বলছেন ম্যাডাম? দেরাজে অত দামী একটা মূর্তি তাছাড়া ওটার মধ্যে যে গয়না বা টাকা রয়েছে তাও নেহাত কম নয়।
অসীমঃ চোর এল টাকা পয়সা না নিয়ে শুধু মূর্তিটা নিল। রীতিমত নির্লোভ চোর বলতে হবে।
সমিতাঃ এত ভারী দেরাজ, তালা ভাঙল কেউ আওয়াজ পেল না।
প্রফেসর বাগচিঃ মাষ্টার কি ইউজ করেছে বোধহয়।
ত্রিপাঠীঃ মাষ্টার কি দিয়েও ওই তালা খোলা সহজ নয় মিষ্টার বাগচি।
অসীমঃ তাছাড়া আপনি যে মূর্তিটা ঘরে এনে রেখেছেন সেটাও তো বাইরের লোকের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।
সমিতাঃ এমনিতে আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?
ত্রিপাঠীঃ আমি একাই থাকি। স্ত্রী গত হয়েছেন পাঁচ বছর হল। ছেলে দুর্গাপুরে পাকাপাকি ভাবে থাকে। ওখানেই ব্যবসা করে। মাঝে মধ্যে আসে। আর বাড়িতে থাকে বলতে সুদর্শন…
প্রফেসর বাগচিঃ সুদর্শন কে?
ত্রিপাঠীঃ সুদর্শন আমার ছোট বেলার বন্ধু। প্রাইমারি স্কুলে মাষ্টারি করত। রিটায়ারমেন্টের পর আমার সঙ্গে থাকে। পার্সনাল অ্যাসিস্টেন্ট বলতে পারেন। কালনায় বাড়ি। সপ্তাহে একবার বাড়ি যায়।
সমিতাঃ কতদিন ধরে তিনি আপনার এখানে আছেন?
ত্রিপাঠীঃ তা আমার স্ত্রীর মৃত্যুর পর আমি ভীষণ একা হয়ে গেলাম। তখন আমিই ওকে আমার এখানে কাজের কথা বললাম। কেন ? আপনারা কি ওকে সন্দেহ করছেন?
প্রফেসর বাগচিঃ এখানে যতজন ক্যারেক্টার রয়েছেন সকলেই সাসপেক্ট। সুদর্শন বাবু ছাড়া আর কে কে থাকেন?
ত্রিপাঠীঃ গোটা কয়েক চাকরবাকর, রান্নার লোক রয়েছে। আমার ঠিক জানা নেই। ওই ব্যপারটা সুদর্শনই দেখে।
সমিতাঃ তা আপনার ছেলে লাস্ট কবে এসেছিলেন?
ত্রিপাঠীঃ ও তো এখন এখানেই আছে।
প্রফেসর বাগচিঃ সবার সঙ্গে একবার কথা বলা যাবে কি?
ত্রিপাঠীঃ অবশ্যই আমি সুদর্শনকে বলে দিচ্ছি।