তাপস মহাপাত্র
মধ্য প্রাচ্যের যুদ্ধের আবহের মধ্যে বড়সড় সিদ্ধান্ত নিল ব্রিকস গোষ্ঠিভুক্ত দেশগুলি। উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের ক্ষেত্রে বিপরীত অবস্থানে থাকা ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার মতপার্থক্য দূর করে একটি সর্বসম্মত ঘোষণা তৈরির লক্ষ্যে সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা উদ্যোগী হলেন। ফলস্বরূপ, একটি যৌথ ঘোষণায় একমত হয়েছে ‘ব্রিকস’ গোষ্ঠিভুক্ত দেশগুলি। ওয়াকিবহাল মহল সূত্রে এমনটাই জানা যাচ্ছে। জোটের আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লিতে চলতি শীর্ষ সম্মেলন শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই এই সমঝোতার খবর পাওয়া গেছে।
উপসাগরীয় সংঘাত নিয়ে সদস্য দেশ ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার বিভেদ দূর করার প্রত্যাশা নিয়ে এই সম্মেলনটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন আমেরিকা ও ইরান তাদের ছয় মাসব্যাপী লড়াইয়ে একে অপরের ওপর পাল্টাপাল্টি হামলা পুনরায় শুরু করেছে। এর আগে আগস্ট মাসের বড় একটি সময়জুড়ে লড়াই কিছুটা স্তিমিত ছিল; তবে সেই সময়ে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছিল।
জানা যাচ্ছে, আলোচকরা এমন একটি যৌথ ঘোষণায় একমত হয়েছেন যেখানে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করা হবে না, তবে যেকোনো দেশের একতরফা যুদ্ধের নিন্দা জানানো হবে। সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, শনিবারই জোটের নেতারা এই নথিতে অনুমোদন দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও এই ঘোষণা নিয়ে আয়োজক দেশ ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি। বৈদেশিক নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে এমন ভাষা খুঁজে বের করাটাই হবে জোটের জন্য বড় পরীক্ষা—যা আবুধাবি ও তেহরান উভয়ই মেনে নিতে পারবে এবং যার মাধ্যমে যৌথ ঘোষণার পথ প্রশস্ত হবে।
তারা আরও বলেছেন, এ ধরনের যৌথ বিবৃতি হয়তো বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না; তবে পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর নীতির বিরুদ্ধে উদীয়মান দেশগুলোর এই জোটের ঐক্য প্রদর্শন করবে। মনে রাখতে হবে, এর আগে মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার মতপার্থক্যের কারণে কোনো যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
ব্রিকস জোট আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও ডব্লিউটিও-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবি জানিয়ে নিজেদের অবস্থান বা গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কারণ জোটের কোনো কোনো সদস্য মনে করে, এইসব প্রতিষ্ঠান পশ্চিমি শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
এই পরিস্থিতিতে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনা—বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সংঘাতের জেরে সৃষ্ট পরিস্থিতি সামাল দেওয়া—এবং সম্মেলনের একটি সর্বসম্মত ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করা ব্রিকসের কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের জন্য একটি জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হওয়ার জেরে সংযুক্ত আরব আমিরাত গত আগস্ট মাসে ইরানের সঙ্গে সমস্ত বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছিল।

বলাবাহুল্য, এবার এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী নেতাদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চিনের শি জিনপিং, ইরানের মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার সিরিল রামাফোসা এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।