অর্পিতা মুখার্জী: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক জয়ের পর প্রথমে উল্লাসে ফেটে পড়েছিল ওয়াল স্ট্রিট। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই ছবিটা পুরো উল্টে গেল। বৃহস্পতিবার ভয়াবহ বিক্রির চাপে মুখ থুবড়ে পড়ল মার্কিন শেয়ার বাজার।
একাধিক সূত্রের দাবি, নাসডাক কম্পোজিট একদিনে ৫.৫২ শতাংশ পড়েছে। গত ১৯ মাসে এত বড় পতন দেখেনি এই সূচক। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ পড়েছে ৪.৩৬ শতাংশ, ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ নেমেছে ৩.৪৪ শতাংশ। তিনটি সূচকেরই এপ্রিল ২০২৫-এর পর এটাই সবচেয়ে বড় একদিনের পতন। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নাসডাক ১০০-র। একদিনে ৬.৩৬ শতাংশ পড়ে গিয়েছে এই সূচক। কোভিডের সময় ২০২০ সালের পর এত বড় ধস দেখা যায়নি।
কেন হঠাৎ এই ধস?
চাঞ্চল্যকর এই পতনের নেপথ্যে মূল কারণ এআই ও চিপের শেয়ার। গত এক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বাজারে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, তাতেই এবার প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন বিনিয়োগকারীরা। দাম কি খুব বেশি বেড়ে গিয়েছে? এআই-এর পিছনে এত খরচ কি শেষ পর্যন্ত উঠবে?এই আশঙ্কাতেই প্রথমে বিক্রি শুরু হয় সেমিকন্ডাক্টর সংস্থাগুলিতে।
এএমডি একদিনে ১৭.৩ শতাংশ, মাইক্রন টেকনোলজি ১৭.৫ শতাংশ পড়েছে। এনভিডিয়া হারিয়েছে ৯.৩ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সবচেয়ে খারাপ দিন। স্মার্টফোন চিপের বিক্রি নিয়ে হতাশাজনক পূর্বাভাস দেওয়ার পর কোয়ালকম পড়েছে ৯.৫ শতাংশ। চিপ সংস্থা থেকে এই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ডেটা সেন্টার, সার্ভার, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাগুলিতেও। কারণ এআই-এর পুরো ব্যবসাটাই দাঁড়িয়ে আছে ডেটা সেন্টার তৈরির উপর।
নির্বাচনের জয়ই হয়ে গেল চিন্তার কারণ
মজার বিষয় হল, যে নির্বাচনের ফলে বাজার প্রথমে লাফিয়ে উঠেছিল, সেই নির্বাচনই পরে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াল। মিডটার্মে ডেমোক্র্যাটরা হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সেনেট, দুটোই দখল করেছে। টেক্সাস, কানসাস, নর্থ ক্যারোলাইনা, সাউথ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, আইওয়া, মেইন-সহ একাধিক রাজ্যে রিপাবলিকানদের হারিয়ে সেনেটের আসন ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এটা বড় ধাক্কা। জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং ইরান-সংঘাত নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভকেই এই ফলের নেপথ্যে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
কিন্তু ভোটের প্রচারে একাধিক ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এআই ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, ডেটা সেন্টার প্রচুর বিদ্যুৎ খায়, পরিবেশের ক্ষতি করে এবং স্থানীয় মানুষের খরচ বাড়িয়ে দেয়।
বিনিয়োগকারীদের এখন ভয়, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানেই ডেটা সেন্টার নিয়ে কড়া নিয়ম, নতুন প্রকল্পে দেরি বা নিষেধাজ্ঞা। আর ডেটা সেন্টার তৈরিতে গতি কমলেই ধাক্কা খাবে চিপ নির্মাতা থেকে শুরু করে গোটা এআই চেন।
বুধবার, ৪ নভেম্বর নির্বাচনের ফলের পর ডাও জোন্স খোলার মুখেই ১০০০ পয়েন্টের বেশি উঠেছিল। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ তিন মাসের মধ্যে সেরা দিন কাটিয়েছিল। সেই লাভ তুলতেই বৃহস্পতিবার বিক্রি শুরু করেন অনেকে। তার উপর এআই শেয়ারের পতন মিলে বাজারে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। ভোলাটিলিটি সূচক লাফিয়ে ওঠে, যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
অর্থাৎ, মিডটার্মের জয় বাজারে স্বস্তি এনেছিল ঠিকই, কিন্তু এআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তাই শেষ পর্যন্ত ওয়াল স্ট্রিটকে ধাক্কা দিল।