পয়লা ডিসেম্বর ছিল ধর্মেন্দ্র সিং দেওলের জন্মদিন। তাঁর চলে যাওয়ার পর এই প্রথম জন্মদিন। এদিন গোটা দেশ তাঁকে স্মরণ করেছে অগাধ ভালোবাসা ও বেদনার সঙ্গে। সবাই তাঁর বীরত্ব, তাঁর সুদর্শন উপস্থিতি, তাঁর অগণিত হিট সিনেমার কথা বলছে এখন। কিন্তু আমি বলতে চাই অন্য এক গল্প— সেই নীরব, অন্তর্মুখী, আলোহীন কোণ থেকে— যেখানে দাঁড়িয়ে আমি, প্রকাশ কাউর, দীর্ঘ একাত্তর বছরের দাম্পত্যজীবনে তাঁকে দেখেছি, ধরেছি, হারিয়েছি, আবার ফিরতেও দেখেছি।
আমার জন্ম এক সাধারণ পাঞ্জাবি পরিবারে। ঘরোয়া পরিবেশ, আচার-অনুষ্ঠানে ভরা, খুব সাজানো-গোছানো জীবন। মাত্র ক’টা স্বপ্ন ছিল— শান্ত সংসার, কিছু হাসি, কিছু চোখের জল, আর পরিবারের জন্য নিজের সবটুকু দেওয়া। ১৯৫৪ সালে আমাদের আয়োজন করে বিয়ে হয়। তখনও জানতাম না যে আমার জীবনের সঙ্গী একদিন ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় নক্ষত্রগুলোর একটিতে পরিণত হবেন।

ধর্ম যখন প্রথম বম্বে যায়, তখন তাঁর হাতে ছিল শুধু স্বপ্ন আর অসাধারণ রূপ। তাঁর প্রথম ছবি ‘দিল ভি তেরা হাম তেরে’(১৯৬০) মুক্তি পাওয়ার সময় আমি বুঝতেই পারিনি যে এই পথ কত দীর্ঘ, কত কঠিন হতে চলেছে। তারপর এল ১৯৬৬— ‘ফুল আউর পত্থর’। সেদিন থেকে ভারত প্রথম দেখল এক অদ্ভুত কাঁচা পুরুষালি আকর্ষণে ভরা নতুন নায়ককে। সেই ছবির পর থেকেই আমাদের জীবন আর আগের মতো ছিল না। স্টুডিও, শুটিং, আলো, ক্যামেরা, ভিড়, জনতা— সবকিছু তাঁকে ঘিরে ধরতে শুরু করল।

লোকজন বলত— “তোমার স্বামী তো আজ ভারতীয় সিনেমার রাজা।”
কিন্তু আমি জানতাম— তিনি শুধু আমার ধর্ম, আমার ঘরের মানুষ।
তারপর শুরু হল ৬০ এবং ৭০-এর দশকের ঝড়। হকিকৎ, অনুপমা, আয়ে মিলন কি বেলা, বন্দিনী, সত্যকাম— প্রতিটি চরিত্রে তিনি যেন নিজেকে নতুনভাবে চিনতে লাগলেন। আর তারপর ৭০-এর দশকে এলো তাঁর অপ্রতিরোধ্য তারকাখ্যাতির দিন— মেরা গাঁও মেরা দেশ, কর্তব্য, সমাধী, সীতা আউর গীতা, ধরমবীর আরও কত চলচ্চিত্র! আর অবশ্যই— শোলে। সেই ছবির পরে দেশ শুধু তাঁকে তারকা নয়— নায়ক হিসেবে চিনতে শুরু করল।

এই সবকিছুর মাঝেই একজন স্ত্রী হিসেবে আমার জীবনটা ছিল আলাদা। আলোয় ভরা সেই দুনিয়া আমার ছিল না। আমি ছিলাম ঘর, সন্তান, সংসার, আর অগোচরে তাঁর পাশে দাঁড়ানো অসংখ্য রাতের সঙ্গী। গসিপ পেপার, রটনা, কানাঘুষো— সবই আমার কানে আসত। বিশেষ করে যখন হেমা মালিনীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হল, তখন অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করত, “আপনি কিছু বলছেন না কেন?”
আজ এত বছর পর বলছি, আমি নীরব ছিলাম দুর্বলতার জন্য নয়।
আমি নীরব ছিলাম কারণ আমি তাঁর ওপর ভরসা করতাম।
একজন মানুষের শুধু ভুল দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁর হৃদয়, তাঁর দায়িত্ববোধ, তাঁর ভালোত্ব নিয়েও বিচার করতে হয়।
হয়তো তিনি সবসময় আদর্শ স্বামী ছিলেন না, কিন্তু তিনি সবসময়ই অসাধারণ বাবা ছিলেন।
ছেলেমেয়েদের জন্য তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো শক্ত। সানি, ববি— তাদের সাফল্যের পেছনে তাঁর দৃঢ় শিক্ষা, তাঁর সাহস, তাঁর নিঃশব্দ ভালোবাসার বড় ভূমিকা আছে।

মানুষ তাঁকে “হি ম্যান” বলত। পেশির জোর, অ্যাকশন, সাহস— এ সব তাঁর পরিচয়। কিন্তু একজন স্ত্রী হিসেবে আমি জানি তাঁর নরম দিকটা। ‘অনুপমা’র সূক্ষ্ম অভিনয়, সত্যকাম-এর মর্মস্পর্শী সত্যবাদিতা, চুপকে চুপকে-র নির্ভেজাল কমেডি, গুড্ডি এবং খামোশি-র মানবিকতা— এগুলোই আসলে তাঁর সত্যিকারের পরিচয়। মানুষের চোখে তিনি হিরো, কিন্তু আমার চোখে তিনি ছিলেন এক নরম, সৎ, গভীর মানুষ, যিনি আলো-আঁধারের মাঝেও পরিবারকে ধরে রাখতে চেয়েছেন।
৭০ পেরিয়ে ৮০–৯০ দশকেও তিনি লড়াই করে গেছেন। হুকুমত, এলান-এ- জঙ্গ, মর্দওয়ালে বাত আরও অগণিত ছবি। সব জায়গায় তিনি নিজের উপস্থিতি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। রকি আউর রানি কি প্রেম কাহানি-তে তাঁর শেষদিকের অভিনয় দেখলে মনে হয় মানুষটা বয়স মানেনি, অভিনয়ও নয়।

তাঁর জন্মদিনে, তাঁর অনুপস্থিতির প্রথম জন্মদিনে, আমি চাই মানুষ তাঁকে তারকা হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে মনে রাখুক। যিনি ঘরের বাইরে ছিলেন দেবদাস, কিন্তু ঘরের ভিতরে ছিলেন এক সরল, স্নেহপূর্ণ, লাজুক মানুষ। যিনি হয়তো আমার মন অনেকবার ভেঙেছেন, কিন্তু পরিবারকে কোনওদিন ভাঙতে দেননি। আজ আমি প্রকাশ কৌর, সেই নীরব রক্ষক, সেই অদেখা স্তম্ভ— তাঁর জন্মদিনে শুধু এটুকুই বলব—
“ধর্ম, তুমি তো মানুষের নায়ক ছিলে।
কিন্তু আমার কাছে তুমি ছিলে শুধু আমার মানুষ।
এ জন্মদিন তোমার ছাড়া প্রথম—
তবু আজও তুমি আছো, ঠিক আমার হৃদয়ের ভাঁজে।”
যদি এই লেখা পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে তাহলে অনুরোধ, ধর্মেন্দ্রকে আপনার স্মৃতিতে যেভাবে রেখেছিলেন, সেভাবে রাখুন। মানুষ হিসেবে, স্বামী হিসেবে, বাবা হিসেবে— তাঁর আলোকজ্জ্বল ও অন্ধকার মুহূর্ত মিলিয়ে।
- রজত ভট্টাচার্য
