ওঙ্কার ডেস্ক: আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে রাশিয়া এবং আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের মধ্যে সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে, কারণ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সংকটে থাকা তালিবান সরকারের সঙ্গে রাশিয়ার এই ঘনিষ্ঠতা উদ্বেগের কারণ হতে পারে বহু দেশের।
মস্কোর উপকণ্ঠে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সম্মেলনের মঞ্চে দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে সই করেন। যদিও চুক্তির সমস্ত শর্ত প্রকাশ্যে আনা হয়নি, তবে জানা গিয়েছে সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময়, অস্ত্র সংক্রান্ত সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত যৌথ কর্মসূচি এতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। আফগানিস্তানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর কাছে এটি একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্যে তারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা চালিয়ে আসছে।
২০২১ সালে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর তালিবান সরকারকে অধিকাংশ দেশ এখনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। তবে গত কয়েক বছরে রাশিয়া ধীরে ধীরে কাবুলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পথে হাঁটতে শুরু করে। ২০২৫ সালে তালিবান শাসিত আফগানিস্তানকে স্বীকৃতি দিয়েছে মস্কো। দুই দেশের মধ্যে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বাণিজ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতার ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতাতেই এবার সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হল।
বলা বাহুল্য, মধ্য এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব আরও সুসংহত করতে চায় রাশিয়া। ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটার পর মস্কো বিকল্প কৌশলগত অংশীদার খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। আফগানিস্তান সেই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আফগানিস্তান এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সক্রিয় জঙ্গি সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে তালিবান সরকারের জন্য এই চুক্তি সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা আফগান প্রশাসন বিদেশি সমর্থন ও সহযোগিতা পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে এই সম্পর্ক তাদের সেই লক্ষ্যপূরণে সহায়ক হতে পারে বলে। এই চুক্তি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পাকিস্তান, ইরান, চীন এবং ভারতের মতো দেশগুলি পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে। আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরি হলে তার প্রভাব গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর পড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
প্রসঙ্গত, একসময় সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে যে শক্তির উত্থান ঘটেছিল, সেই তালিবানের সঙ্গে আজ রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতারই প্রতিফলন। অতীতের সংঘাতকে পিছনে ফেলে দুই পক্ষ এখন কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতার পথ বেছে নিয়েছে।