অর্ণব দত্ত
মানব সমাজের সৃষ্টির পর থেকেই মানুষে মানুষে তেলেজলে মিলছে না। পরিবার-রাষ্ট্র-সমাজতন্ত্র বইতে ফেড্ররিক এঙ্গেলস লিখেছেন, ‘প্রাচীন মানব নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। নারী ধর্ষণ, খুনোখুনি ছিল জলভাত। এবাদে নারী, অপহরণ ইত্যাদি চলত।
এরপর যখন উদয় হল রাজার তখন দেখা গেল রাজা রাজত্ব চালাতে দেদার স্বজনপোষণ করেছেন। সাধারণ মানুষের বরাবর রাজার আদেশ শিরোধার্য করে চলতে হত। না হলে গর্দান অনিবার্য। অবশেষে নানা রাজপথ, জনপথ পেরিয়ে উদয় হল ভারতের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের। অতীতের স্মৃতিচারণ না করে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, গৃহদাহ পর্ব চলছে। ভারতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বহু নাগরিককে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। রামকৃষ্ণ মিশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট স্বামী দিব্যানন্দ মহারাজ সম্প্রতি বলেছেন, ‘চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম।
যাঁরা একাকী কিংবা দোকা তাঁদের পরিবার থেকে বের করে দেওয়া যেমন দুভার্গ্যজনক, এদিকে রাস্তায় যাঁরা আছেন তাঁরাও স্বখাতসলিলে ডুবে মরছেন। অনেক সময়ে দেখা যাচ্ছে, রাস্তাঘাটে তাঁরা বিশাল গোলমাল পাকাচ্ছেন। অনেকক্ষেত্রে যাঁদের ঘর ছাড়া করা হচ্ছে, তাঁরা মিলেমিশে থাকতে পারছেন না বলে বাইরে বের করে দেওয়া হচ্ছে বলে একাধিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে। সেই কথাই বলেছেন রামকৃষ্ণ মিশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট শ্রীমৎ স্বামী দিব্যানন্দজি।
রামায়ণে রামচন্দ্র, সীতাকে বনবাসে যেতে বাধ্য করেছিল তাঁর পরিজনরা। অসহ্য যন্ত্রণা সয়ে রামচন্দ্র ফের হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধার করেছিলেন। অযোধ্যার বাসিন্দারা রামসীতাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। তার আগে অবশ্য রক্তপাত, হিংসা এবং লঙ্কাকাণ্ড বাঁধে। এক্ষেত্রে বানরসেনার ভূমিকা যতদিন সূর্যচন্দ্র থাকবে, ততদিনই অমর থাকবে।
ভারতের আরেকটি মহাকাব্য মহাভারতের কাহিনিও একই। ভাইয়ে-ভাইয়ে নারীঘটিত এবং রাজ্যের অধিকার নিয়ে বিস্তর ঝামেলার ফলে কৌরব-পাণ্ডবে রক্তারক্তি কাণ্ড। প্রবল হানাহানির পরে ফের ন্যায়ের জয়, অন্যায়ের পরাজয়।
আর যদি আধুনিক পৃথিবীর কথা ধরা যায়, তাহলে প্রবল পরাক্রমশালী এবং অত্যাচারী হিটলার পরিণতিতে আত্মহত্যা করলেন। ভারতের কারা যেন রটিয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যায় না, তবে অস্ত গেল। কেননা প্রাকৃতিক নিয়ম হল সূর্যের উদয়াস্ত হবেই। তারপর ধরা যাক, ডাইনোসরের মতো প্রাণী যা ভয়াবহ রকমের হিংস্র সেও দুনিয়া থেকে বিলীন হয়ে গেল। ডাইনোসরের অস্থি এখন জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে।
তবে লাভ হয় খানিক বটে, একইসঙ্গে ক্ষতিও হয় অনেক। দেশ স্বাধীনের ৮০ বছর পরে দেখা যাচ্ছে, সাদা বিদেয় হয়ে বাদামি চামড়ার ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা এসেছে বটে, এরপর চলছে ভারতমাতাকে নিয়ে ভাগাভাগির খেলা। রাজায়-রাজায় যুদ্ধ হলে উলুখাগড়ার প্রায় যায় বলে যে প্রবাদবাক্য চালু আছে, তা আজ সর্বাংশে সত্য। আবার উল্টো ব্যাপারও আছে। একসময়ে মনে করা হত আদার ব্যাপারীদের জাহাজের খবর রেখে কি হবে ? এখন সারা বিশ্বে সংবাদ মাধ্যম এবং প্রযুক্তির দৌলতে মাছিমারা কেরানিরাও জাহাজের খবর রাখছেন। দেখছেন কাণ্ডকারখানা।
সম্প্রতি দৈনিক কাগজে প্রকাশিত একটি সংবাদ ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। খবরটি হল ইউরোপের একটি দেশে গবেষণারত এক অবিবাহিতা তরুণী কলকাতার অভিজাত বৃদ্ধাশ্রমে তাঁর মায়ের কাছে এসেছিলেন। এরপর তিনিই বৃদ্ধাশ্রম থেকে বেরিয়ে শিয়ালদহ স্টেশনে ওয়েটিং রুমে তল্পিতল্পা নিয়ে অসহায়ভাবে কয়েকদিন কাটানোর পরে রেল পুলিশের নজরে আসে ব্যাপারটা। অতি উচ্চশিক্ষিত ওই তরুণীর দিদি ইউরোপের একটি দেশের বাসিন্দা। খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে কলকাতার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ওই তরুণীকে উদ্ধার করে এবং ওঁর দিদিকে খবরটা জানায়। এরপর দিদি বোনকে ইউরোপে ফেরান। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘কুমাতা কদাপি নয়।
তবে মা হওয়া আবার মুখের কথাও নয়। কী যে ঘটেছিল, মেয়ের সঙ্গে অভিজাত বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা ওই বিধবা বৃদ্ধার তা রিপোর্টে ছাপা হয়নি। ফলে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। যে সমস্ত মানুষ রাস্তাঘাটে অথবা ফুটপাথে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে ৪৭৪জন নাগরিক ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারির মধ্যে শৈত্যপ্রবাহে মারা গিয়েছে দেশের রাজধানী দিল্লিতে।
খোদ দেশের রাজধানীতে তিন লক্ষাধিক বাসিন্দা ফুটে থাকেন। এদিকে ফুটপাথবাসীদের জন্যে পরিকল্পনা ইউপিএ – টু সরকার ন্যাশনাল আরবান লাইভলিহুড মিশন শেল্টার ফর আরবান হোমলেস স্কিম, ২০১৩ সালে চালু হয়।
সমীক্ষা অনুসারে, যাদের ঘর থেকে রাস্তায় বের করে দেওয়া হচ্ছে তাঁদের অধিকাংশ রাস্তাঘাটে বেরিয়ে ভীষণ অসভ্যতা করছেন। এতে নাগরিক জীবনের স্বাভাবিকতা নষ্ট হচ্ছে। সারা দেশের সব শহরে একই পরিস্থিতি। রাজধানী দিল্লিতেও।
যাঁরা একাকী কিংবা দোকা যাঁদের পরিবার থেকে বের করে দেওয়া যেমন দুভার্গ্যজনক, এদিকে একাধিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, অনেককে গৃহহারা হতে হচ্ছে মিলেমিশে না থাকার জন্যে। তারা পরিজনদের সঙ্গে ঘরে ঘরে অশান্তি করছেন নিজেদের ভিতর। যা খেয়োখেয়ির চেহারা নিচ্ছে। ফলে অশান্তি থামাতে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পরে রাস্তাঘাটে অশান্তি পাকাচ্ছেন একশ্রেণির গৃহহারা।
এই শেষ কোথায় বলা খুবই কঠিন ব্যাপার। আসলে শেষ বলে কিছুই নেই, অবশেষ আছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে সেজন্যেই পাখনা মেলে দূর আকাশে পাড়ি দেয় ফিনিক্স পাখি। আসলে কল্পনা করতে করতে তা একসময়ে বাস্তব হয়ে যায়। কিন্তু অনেক সময় অন্যরকমভাবে। খোদ দেশের রাজধানীতে তিন লক্ষাধিক বাসিন্দা ফুটে থাকেন। এদিকে ফুটপাথবাসীদের জন্যে পরিকল্পনা ইউপিএ টু সরকার ন্যাশনাল আরবান লাইভলিহুড মিশন শেল্টার ফর আরবান হোমলেস স্কিম, ২০১৩ সালে চালু হয়।
নতুন একটি খবর হল, ভারতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, এর কারণ সম্পর্কজনিত জটিলতা। বিশেষত যাঁরা একা কিংবা অবিবাহিত অথবা অবিবাহিতা তাঁদের একাংশের ঠিকানা হারিয়ে শেষপর্যন্ত ফু়টপাথে ঠাঁই পাচ্ছে।
কেন্দ্রের ক্ষমতার রদবদল হয়েছে। এনডিএ সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ভারতের মোট ভূখণ্ডের ৭২ শতাংশ এলাকায় ক্ষমতাসীন বিজেপি। এদিকে দেশের বৃহৎ মেট্রো শহরগুলিতে ফুটপাথবাসীর সংখ্যা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আসলে কিছুতেই ভবী ভোলবার নয়। স্বামী বিবেকানন্দর অমোঘ বাণী, ‘কুকুরের বাঁকা ল্যাজ কিছুতেই সোজা হবে না।’