অন্ধত্ব
প্রদীপ গুপ্ত
লতিফের হাত দুটো নয়ানজুলির বুকের ভেতরে ভেসে থাকা পাটের শরীর থেকে আঁশ গুলোকে ছাড়িয়ে নিচ্ছিল ঠিকই কিন্তু ওর মনটা কিছুতেই ওর বশে থাকছিল না।কাল রাতে ও যে কাজটা করেছে সেটাকে কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিল না লতিফ। ওর মুখের ওপর বলে যাওয়া ওর কোনো সমালোচনাকে লতিফ সহ্য করতে পারতো না। এ অভ্যাসে যে ও অনেক দিন ধরেই অভ্যস্ত সে কথা তো আব্দুলের অজানা ছিল না। তাহলে ও কেন হঠাৎ
– তুমি এইডা হক কাম করতিছ না লতিফ ভাই।
– কোনডা মিঞা ?
– তুমি নাকি হুলিয়া দেছ সবারই নাকি তিন ভাগার এক ভাগা পাট তোমার অফিসি জমা দিতি হবে ?
– অঃ ,তা অন্যায় ডা কী কইরলাম মিঞা ?
– এইডা কী কও তুমি ? তুমি তোমার অতীতডারে কি পুরা বন্ধক রাখলা নাকি ভাই ?
– আবার প্যেনাইতে শুরু করলা মিঞা ? যুগ পালটাইসে, অহনে আর আগের কাইল নাই।
– যুগ পালটায় নাই ,তুমি পালটাইসো ,হেই দিন গুলানের কথা ভুইল্যা গেলা কীভাবে কও দেহি ? হেই রাইত গুলানের কথা ? একলগে কত রাইত জাইগ্যা পাহারা দিসি ওই শালার হারামী জমিদারের কুত্তা আর খাঁকি শ্যাল গুলানের হাতের থিক্যা—
– দ্যাহ মিঞা নিজের কাম করো গিয়া , এত কিছু বোঝোনের দরকার নাই তোমার।
– বিরাট বড় মাতব্বর ঠাওরাও তুমি নিজেরে , ঠিক আসে আমিও দ্যাখতাসি তুমি কী কইরা এই কাম করো।
– কী কইরবা কি তূমি এ্যাঁ ? কতটুকু মুরাদ আসে তোমার। চাইরদিকের হাল দেইখ্যাও শরম হয় না? কেউ আর…. দিয়াও পোছে না তোমাগো বুইঝলা?
– হক কথাই কইসো ভাই ,নিজির হাতি প্রধান বানাইয়ে চ্যেরডায় বহনের ব্যবস্থা না কইরলে আইজ তোমার বিড়িডাও….. হেই সকল কথা ছাড়ান দিলাম ,ভুল হইয়েছে যহনে তোমার টেরিতি তেল পইরল,ধূতি পাঞ্জাবি সদরের থিক্যা পাট পাট হইয়ে আসতি লাগলো তখনও গেরামের মানুষ গুলার কওয়ায় কান না দেওয়া।
– ক্যান কান দ্যেও নাই ক্যেন ? ভয় পাইসিলা ,হ্যে হ্যে ভাবসিলা কিসু কইলে লইতফায় যদি …..
– নারে ভাই ভয় পাই নাই পাইসিলাম লজ্জা ,শরমে বুক ফাইট্যা যাইতো,ভাইবতাম উপুর দিকি থুতু ছেটালি তো নিজির গায়ে আইসেই পড়বে। কোনো মোছলমান শুয়োরের মাংস মুহে দি তো আর মাইক ফুয়াতি পারে না । তা ঠিক আসে দ্যেহ তুমি কী করতি পার আর আমিই বা কী করতি পারি । তুমি না হয় চ্যের ধরি রাখতি জামা পেইল্টেসো ,গুন্ডা,বদমাইশ ,পুলিশ ,পেসাশন বেবাকডি ,……।
আব্দুল মিঞা যে লতিফকে এ ভাবে কথাগুলো বলবে লতিফ সেটা স্বপ্নেও ভাবে নি। দীর্ঘ দিনের ক্ষমতায় থাকার অভ্যাসের কারণে কোনো রকম হুমকিকে বরদাস্ত করা ওর স্বভাব বিরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আব্দুলের কথাগুলোকেও ও স্বাভাবিক ভাবেই …।
সে দিন রাতেই ও সুকুর-কালু-রামা আর বাবলিকে জড়ো করলো। ওরাও ওর সাথেই পুরানো দল ছেড়ে…।
নাহ প্রাণে ও মারবে না, মারতে পারবে না। মানুষের কিছুটা হলেও তো টিকে আছে ওর ভেতর। জমিদারদের থেকে এ এলাকার তাবৎ জমি আব্দুলের নেতৃত্বেই তো ছিনিয়ে নিয়ে দুজনে মিলে সেগুলোকে বিলিয়ে দিয়েছিল জমিহীন চাষিদের ভেতর। জনপ্রিয়তার ভিতটাতো আব্দুলের হাত ধরেই তৈরি হয়েছিল লতিফের। আব্দুলের কাছে পার্টি প্রধান হবার কথা বললে আব্দুল লতিফকে ডেকে বলেছিল ভাই তুই পঞ্চায়েতটা দ্যেখ আর আমি পার্টিটা। সেই আব্দুল মিঞাকে……না না এতটা অমানুষ লতিফ হয়ে ওঠেনি এখনও। কিন্তু ধমকানোর শাস্তিটাতো –ও কালু-সুকুরদের ডেকে নিখুঁত ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিল ছবিটা ।
দুটো হাত দিয়ে লতিফ নয়ানজুলিতে পাটের শরীর থেকে আঁশ তুলছে। গ্রামের সারাটা আকাশ তখনও কালো ধোঁয়ায় ঢাকা।আব্দুলের জমিতেই শুধু নয় গ্রামের সবার জমিতেই এবার পাটের ফলন ভালো । আর ভাল ,আব্দুলকে লতিফ জানে মারেনি , কিন্তু…..।
– লতিফভাই—–লতিফভাই
কালু হাঁফাতে হাঁফাতে এসে ধপ্ করে বসে পড়লো নয়ানজুলির পাড়ে। লতিফ তৈরী হয়েই ছিল। ও জানতো আব্দুলও সহজে ছেড়ে কথা বলবে না। অস্বীকার দিয়ে শুরু করবে, কাজ নাহলে বড়বাবুকে বলাই আছে কি করতে হবে ।
– কি হইয়েসে ঠিক করি বল ন্যাকামো কইরবার সুময় নাই।
– আব্দুল চাচা…।
– কি কইরেছে ?গাঁয়ের লোক জড়ো কইরেছে?
– না……।
– তালি কি পুলিশির কাছে গেছে ?
– না…………..
– তালি কি করিছে ডা কি বইলবি তো ন্যাকাচো……।
– গলায় দড়ি দেছে ?
– কী বইললি ? দড়ি দেছে ?
– হ্যাগো মিঞা ঘরের আগুন নেবাতি গিয়ে ঘরে আগুন, কোন শুয়ারের বাচ্চা দাদার ঘরে…….ঘরের পাশেই তো পাটগুলান ডাই দেওয়া ছেল….
লতিফের দু-চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে । ও কখনই চায়নি আব্দুল কে মেরে ফেলতে। সেই আব্দুল যে আব্দুল ওকে হাতে ধরে ওর জীবন গড়ে দিয়েছে, যে আব্দুল ওর নিকাহর সময় বাপের মতো দঁড়িয়ে থেকে ওদের শাদী দিয়েছে, সেই আব্দুল — যে আব্দুল, ……আর কিছু মাথায় আসছে না লতিফের। গাটা কেমন যেন গুলিয়ে উঠছে লতিফের। ও হেরে গেল, ওর লোকেরাই ওকে …………
হাতে একগোছা পাটের আঁশ। লতিফ উঠে আসছে ডাঙায়। কালু লতিফের এই চেহারা কোনো দিনও দেখেনি। ও হাত পাগুলোকে গুটিয়ে নিজেকে ছোট করে নিচ্ছে ।
‘”শুয়োরের বাচ্চা ঘরের কাছেই পাট লাট দেওয়া ছিল, না ? ঘরের কাছেই ?” লতিফের হাতের পাটের গোছা কালুর গলায় চেপে বসছে, কালুর নাক, মুখ, গলা দিয়ে …… লতিফের চোখ আর কিছু দেখছে না। ও অন্ধ হয়ে গেছে। এই অন্ধত্ব কি ভালবাসার ? এই অন্ধত্ব কি আনুগত্যের , এই অন্ধত্ব কি হতাশার, নাকি এই অন্ধত্ব………।