ওঙ্কার ডেস্ক: ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আমেরিকা ও ইরানের বহুল আলোচিত শান্তি আলোচনা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যাওয়ার পিছনে একাধিক জটিল ও গভীর কারণ কাজ করেছে। মূলত পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এই চারটি বড় ইস্যুই আলোচনার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রথমত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। আমেরিকার দাবি ছিল, ইরানকে শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতেও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কঠোর নজরদারির আওতায় আসতে হবে। কিন্তু ইরান এই শর্তকে তাদের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছে। তেহরানের মতে, তারা শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার অধিকার রাখে এবং সেই অধিকার কোনওভাবেই ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে এই ইস্যুতেই বড় অচলাবস্থা তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইরান চেয়েছিল, আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়েই আমেরিকা তাদের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিক, যাতে দেশের অর্থনীতি স্বস্তি পায়। অন্যদিকে আমেরিকা চাইছিল, আগে ইরান তাদের শর্ত মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিক, তারপর ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। প্রথম পদক্ষেপ কে নেবে প্রশ্নেই আলোচনার গতি থমকে যায়।
তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালী এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই দেশের কৌশলগত সংঘাতও বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হরমুজ প্রণালী বিশ্ব তেল পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ, যার নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উভয় দেশেরই কড়া অবস্থান রয়েছে। আমেরিকা চাইছিল এই অঞ্চলে স্বাধীন নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে, আর ইরান চাইছিল নিজেদের প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখতে। ফলে এই বিষয়ে কোনও সমঝোতা তৈরি হয়নি।
চতুর্থত, দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাসও আলোচনাকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দেয়। অতীতে একাধিক চুক্তি ভেঙে যাওয়া এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার অভিযোগ দুই পক্ষের মধ্যেই রয়েছে। ফলে কোনও পক্ষই অপর পক্ষের আশ্বাসে পুরোপুরি ভরসা করতে পারেনি। এই অবিশ্বাসের পরিবেশে কোনও বড় চুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদের বৈঠক শুরু হয়েছিল যথেষ্ট আশাবাদ নিয়ে। প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে টানা আলোচনা চলে এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সেই আলোচনা কোনও ফলপ্রসূ দিশা দেখাতে পারেনি। বৈঠক শেষে আমেরিকার তরফে জানানো হয়, তারা একটি ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব’ দিয়েছিল, যা ইরান গ্রহণ করেনি। তাদের মতে, আলোচনায় পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় নমনীয়তা দেখানো হলেও ইরানের অনমনীয় অবস্থানের কারণেই চুক্তি সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ইরান সরাসরি অভিযোগ তোলে, আমেরিকার প্রস্তাব ছিল একতরফা ও অযৌক্তিক, যা মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
এই ব্যর্থতার ফলে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু দুই দেশের সম্পর্ককেই প্রভাবিত করছে না, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এদিকে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। নতুন করে সংঘাত বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, দ্রুত নতুন করে আলোচনা শুরু না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নিতে পারে।