অর্ণব দত্ত
কাজের তাগিদে বাইরে বেরোতে হয় প্রায় সকলকেই। আর সেই পথঘাট অনেকসময় আতঙ্কের চেহারা নেয় পথ কুকুরের হানায়। দেখা গেছে, ভারতের কসমোপলিটম শহরগুলিতে এই বিপদের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। এই বিপদজনক দিক থেকে যে শহরের নাম সবার আগে উঠে আসে তা হল- দক্ষিণ ভারতের হায়দরাবাদ। এর বাইরে পথ কুকুররা দাঁত ফোটাচ্ছে মহারাষ্ট্র, গুজরাত, কর্নাটক, উত্তরপ্রদেশের মতো বিভিন্ন রাজ্যেও।
কুকুর কামড়ে দিলে জলাতঙ্ক হয়। ৬ জুলাই ১৮৮৫ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার করেন। তার আগে জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হতেন। যার অবধারিত পরিণতি ছিল মৃত্যু।
ভারত সরকারের বক্তব্য, এ দেশে যথেষ্ট পরিমাণে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক মজুত আছে। ফলে চিন্তার কারণ নেই। এদিকে পরিস্থিতি উল্টো। পথ কুকুরের দল সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করছে ১৫ বছরের কম বয়সি ছেলেমেয়েদের উপর। রাস্তাঘাটে আক্রমণের শিকার হচ্ছে ওরা। অনেক সময়ে স্কুল থেকে ঘরে ফেরার পথে কিংবা খেলার মাঠেও। পথ কুকুরের আক্রমণের শিকার হচ্ছে ৪০ শতাংশ নাবালক এবং নাবালিকা।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চের একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ওই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, প্রতিবছর ভারতে কুকুরের কামড়ে ৫ হাজার ৭২৬জন নাগরিকের মৃত্যু হচ্ছে।
পাশাপাশি এও জানা যাচ্ছে, দু’দশক আগে ভারতে প্রতি বছর ২০ হাজার নাগরিক পথ কুকুরের কামড়ে মারা যেত। সেই সংখ্যা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার জানাচ্ছে, বর্তমানে দেশের কোনও রাজ্যে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক টিকার অভাব নেই।
কেন্দ্রের পেশ করা পরিসংখ্যান অনুসারে, সারা দেশে ৮ কোটি ১৭ লক্ষ জলাতঙ্ক প্রতিষেধকের শিশি প্রস্তুত করা হয়। আরও জানা গিয়েছে, প্রতিদিন ভারতে ১০ হাজার অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে পথ কুকুরের আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পথ কুকুরে কামড়ালে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক না নিলে ভাইরাস ক্রমশ স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কে সংক্রমিত হয়। কুকুরের কামড়ানোর পরপর জলাতঙ্কের প্রতিষেধক নেওয়া ইঞ্জেকশন নেওয়া উচিত। এরপর তিনদিন, সাতদিন কিংবা দুসপ্তাহ অন্তর জলাতঙ্ক প্রতিষেধক নেওয়া শ্রেয়।
চিকিৎসকরা আরও জানিয়েছেন, অনেকে কুকুরের কামড়ানোর পরপরই জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকা নিচ্ছেন না। ফলে ভাইরাস প্রথমে শরীরের উপর তেমন প্রভাব না ফেললেও তা সংক্রমিত হয়ে দুই বছর, এমনকি পাঁচ বছর পরও মারণ আকার ধারণ করে।
জনস্বাস্থ্যের পক্ষে বিপজ্জনক ভারতের বিভিন্ন মেট্রো শহরের রাস্তায় পথ কুকুরদের উপদ্রব। এই শহরগুলির মধ্যে রয়েছে কলকাতা। দুনিয়াটা কেবল মানুষ কিংবা অমানুষের নয়, এই দুনিয়া পশুপাখিরও। স্কুলপাঠ্য বইতে যা বাস্তুতন্ত্র হিসেবে বর্ণিত।
ভারতে বহু পশুপ্রেমী সংস্থা রয়েছে, যাঁরা প্রতিদিন সকাল-বিকেল কুকুর-বেড়ালদের খেতে দেয়। এটা যে সামাজিক কাজ, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, হয়তোবা প্রতিমাসে হাজার হাজার টাকা খরচ করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পয়সাওয়ালা পথ কুকুর-বিড়ালপ্রেমীরা খাদ্য বিতরণ করলেও ওঁরা জলটুকু এদিকে দিচ্ছেন না। ফলে তৃষ্ণার্ত পথ কুকুররা আরও হিংসাত্মক হয়ে উঠছে। এদিকে জলই জীবন। কোনও প্রাণ জল না পেলে বাঁচে না। এমনকি গাছপালাও।
ভারত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেশ। হিন্দু ভারতীয়দের সংস্কার অনুসারে, মৃতের পারলৌকিক কাজ হয় নদীপারে। ব্রিটিশ আমলে কিংবা তার আগে নবাবি আমলে মৃত্যুপথযাত্রীকে তাঁর অনুরোধ মতো নদীপারে শুইয়ে রাখা হত শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে পর্যন্ত। এতে নাকি মৃতের আত্মার স্বর্গে উত্তরণের পথ সাফ হয়।
কুকুর ভারতীয় সংস্কৃতিতে নানাভাবে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। মহাভারতে কুকুরকে ধর্ম হিসেবে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে, হিন্দুদের আরেকটি সর্বজনমান্য ধর্মগ্রন্থ শ্রী শ্রী চণ্ডীতে অসুর সেনার সঙ্গে দেবীর যুদ্ধ যখন চরমে সেসময়ে লড়াইয়ের ময়দানে দেবীর সৈনিক হিসেবে ছিল অসংখ্য কুকুর।
পৌরানিক যুগ পেরিয়ে বর্তমানে দুনিয়া আধুনিক। কথায় বলে, ‘ক্লিনলিনেস ইজ নেক্সট টু গড।‘ গীতায় উল্লেখ আছে, ‘বৈদিক ধর্ম তথা কর্ম পালন করতে হলে তা ভারতীয় ভূখণ্ডেই করা যুক্তিযুক্ত।‘ এদিকে, গোটা ভারতের শহর এবং গ্রামীণ এলাকাগুলিতে পথ কুকুরের সংখ্যা অন্তত ৬ কোটিরও বেশি বলে বিভিন্ন পশুকল্যাণ সংস্থাগুলি সূত্রের খবর। ফলে পরিব্রাজকদের পক্ষেও বিপজ্জনক পথ কুকুরের পাল।