নিজস্ব প্রতিনিধি, মৌখালি: বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই রাজনৈতিক চাপে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। নির্বাচনী ফলাফলের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই দলের একাধিক নেতা, বিধায়ক ও প্রভাবশালী মুখের বিরুদ্ধে ওঠা নানা গুরুতর অভিযোগ রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। ঠিক এই পরিস্থিতির মধ্যেই এবার তৃণমূল নেতা তথা ক্যানিং পূর্বের প্রাক্তন বিধায়ক শওকত মোল্লার নাম জড়িয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। যদিও তদন্তকারীরা বাড়িতে পৌঁছে শওকত মোল্লাকে পাননি। পরিবর্তে তদন্তের স্বার্থে তাঁর ছেলে ইমরান মোল্লাকে আটক করে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘোরেন তদন্তকারী আধিকারিকরা।
সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মৌখালিতে অবস্থিত শওকত মোল্লার বাড়িতে হানা দেয় NIA-র একটি বিশেষ দল। ভাঙড়ের দক্ষিণ বামুনিয়া এলাকায় ঘটে যাওয়া বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের সন্ধানেই এই অভিযান চালানো হয় বলে জানা গিয়েছে। তবে তদন্তকারী দল বাড়িতে পৌঁছে দেখতে পায়, মূল ফটকে তালা ঝুলছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও শওকত মোল্লার দেখা মেলেনি বলে সূত্রের দাবি। তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, বাড়িতে উপস্থিত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি শওকত মোল্লার অবস্থান সম্পর্কেও খোঁজখবর নেওয়া হয়। যদিও এ বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কতটা সহযোগিতা মিলেছে, তা নিয়ে স্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে তদন্তের স্বার্থে শেষ পর্যন্ত শওকত মোল্লার ছেলে ইমরান মোল্লাকে সঙ্গে নিয়ে যান NIA আধিকারিকরা।স্থানীয় সূত্রের খবর, ইমরানকে সঙ্গে নিয়ে মৌখালি ও আশপাশের একাধিক এলাকায় যান তদন্তকারীরা। সম্ভাব্য যোগাযোগ, বিভিন্ন সূত্র যাচাই এবং বিস্ফোরণ মামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতেই এই পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও ইমরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও পর্যন্ত NIA-র তরফে কোনও স্পষ্ট বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তদন্তের স্বার্থে সংস্থা আপাতত নীরবতা বজায় রেখেছে।
উল্লেখ্য, ভাঙড়ের দক্ষিণ বামুনিয়া এলাকায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটার পর থেকেই গোটা এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের কারণ, কারা এর পিছনে রয়েছে এবং কোনও বৃহত্তর চক্র সক্রিয় ছিল কি না, তা জানতে তদন্ত শুরু হয়। পরবর্তীতে মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তভার হাতে নেয় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা NIA। তারপর থেকেই একাধিক দিক খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, তদন্ত যত এগোচ্ছে ততই উঠে আসছে নতুন নতুন তথ্য। এর আগেও ভোটের ঠিক আগের দিন গ্রেফতার করা হয়েছিল তৃণমূলের আর এক প্রভাবশালী নেতা ওহিদুল মোল্লাকে। তাঁর গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছিল। সেই সময় থেকেই শওকত মোল্লাকে ঘিরেও জল্পনা বাড়তে থাকে। অনেকেই মনে করেছিলেন, বিস্ফোরণ মামলার তদন্তে কোনও না কোনওভাবে তাঁর নাম সামনে আসতে পারে। অবশেষে বৃহস্পতিবারের ঘটনায় সেই জল্পনাই যেন আরও জোরালো হল।
যদিও তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। দলের নেতাদের একাংশ অবশ্য বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে করছেন। বিরোধীদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। যদিও এই অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও একাধিক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির দাবি, আইন আইনের পথেই চলবে। কোনও অপরাধমূলক ঘটনার সঙ্গে কেউ যুক্ত থাকলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তদন্তই শেষ কথা বলবে। ফলে শওকত মোল্লার বাড়িতে NIA-র উপস্থিতি এবং তাঁর ছেলেকে নিয়ে তদন্ত চালানোকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়বে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
এখন সকলের নজর NIA-র পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। শওকত মোল্লাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হবে কি না, অথবা তদন্তে নতুন কোনও নাম উঠে আসে কি না, তা নিয়েই শুরু হয়েছে জোর চর্চা। একইসঙ্গে ভাঙড় বিস্ফোরণ মামলার তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাও এখন রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।