কস্তুরী সেনগুপ্ত
ভারতবর্ষ সভ্যতার আদিম যুগ থেকেই নারীদের সম্মান দিয়ে এসেছে। তাঁদের দৈহিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক অধিকার লাভের পথে কোন বাধার সৃষ্টি করেনি। বৈদিক যুগ ছিল নারীদের সুবর্ণ যুগ। সেই সময়ই তাদের সর্বাঙ্গীন উন্নতি এবং পূর্ণতা লাভ হয়েছিল। অবশ্য মনু স্মৃতির অন্ধকারময় যুগে কিছুকালের জন্য নারীদের অবস্থার কিছুটা অবনতি ঘটেছিল। অনেকটা রাজনৈতিক, খানিক লৌকিক প্রথাগত কারণ ও এর জন্য দায়ী।মনু স্মৃতির বিধানের কোন নির্দেশকে এর জন্য তেমনভাবে দায়ী করা যায় না। কারণ,আমরা স্মৃতি গ্রন্থে একটি শ্লোক পাই যেখানে নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়েছে। শ্লোকটির ভাবার্থ- “যেখানে নারীগণ পূজিতা হন সেখানে দেবতাগণ খুশি হন, যেখানে তাদের পূজা নেই সেখানে সকল ধর্ম কর্মই নিষ্ফল হয়।” সুতরাং নিঃসন্দেহে একথা বলা যায় যে ভারতবর্ষ চিরকালই নারীদের সম্মান প্রদর্শন করে আসছে।
ভারতে প্রাচীনকাল থেকে নারীই যে পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনের মূল কেন্দ্র তা বারবার দেখিয়ে এসেছে। জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক সকল প্রকার গুণের সম্পূর্ণ বিকাশের জন্য ভারতবর্ষ বহু অনাদিকাল থেকেই নারীদের পুরুষদের মতোই সমান সুযোগ দিয়েছে।
বৈদিক যুগে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন ছিল সে বিষয়ে একটু আলোকপাত করা যাক। ভারতবর্ষের শিক্ষা ব্যবস্থা এক অভিনব শিক্ষাদর্শের পরিকল্পনা থেকেই উদ্ভূত। আত্ম উপলব্ধি করাই ছিল আমাদের শিক্ষার মূল ভিত্তি। অনন্ত জীবনের উপলব্ধি, পূর্ণ জ্ঞান এবং সৎ -চিৎ- আনন্দের উপলব্ধি করাই ছিল জীবনের লক্ষ্য। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্যে, পার্থিব বিষয়ক জ্ঞান অর্জনের মধ্যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সীমাবদ্ধ ছিল না। তখনকার দিনের শিক্ষা ছিল গুরুকুলবাসের শিক্ষা। শিক্ষালাভের জন্য শিক্ষককে কোন অর্থ দিতে হতো না। ভারতীয় শিক্ষাপদ্ধতি সব সময়েই শ্রমের মর্যাদা দিয়েছে। যেমন যজ্ঞের জন্য কাঠ সংগ্রহ করা, গোচারণ, অগ্নি সংরক্ষন, গুরুর জন্য মাধুকরী এই ধরনের কায়িক শ্রম ছাত্ররা প্রতিদিনই করত। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল নীতি ও ধর্ম শিক্ষা। ছাত্রদের বলা হত” ব্রহ্মচারী”, অর্থাৎ যিনি ব্রহ্মকে শুধু বুদ্ধি দিয়ে জানেন না, যিনি ব্রহ্ম লাভের জন্য সাধনা করে থাকেন।
অথর্ববেদে নারীদের ব্রহ্মচর্য এবং বেদ অধ্যয়নের বিষয়টির স্পষ্ট উল্লেখ আছে। পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋক্ বেদে ঘোষা, বিশ্ববারা, অপালা এরকম ২৭ জন ব্রহ্মবাদিনী- ব্রহ্মদ্রষ্টী নারীর দৃষ্ট মন্ত্রের উল্লেখ আছে।
উপনিষদের যুগেও আমরা পাই গার্গী, মৈত্রেয়ীর মতো প্রজ্ঞাশীল নারীদের।
পানিনি যুগের শেষ ভাগে অর্থাৎ খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে বহু প্রসিদ্ধ এবং অধ্যাপিকা নারী বিরাজ করেছে। সেই যুগে নারী শিক্ষক বোঝানোর জন্য উপাধ্যায়া বা উপাধ্যায়ী এবং আচার্যা-র মতো বিশেষ পদ তৈরি করতে হয়েছিল। শিক্ষকের পত্নী নয় স্বয়ং অধ্যাপিকার জন্যই এই বিশেষ পদ গুলি সৃষ্টি করতে হয়েছিল।
ভারত কখনোই অবহেলা করেনি নারীদের। পুরুষদের সঙ্গে সমান তালে পায়ে পা মিলিয়ে শিক্ষা দেবার জন্য যে সদাই সচেষ্ট ছিল তা প্রমাণিত।