ডি- ক্লাসড্
অনিন্দিতা সেন
স্থানীয় একটি নামজাদা মাসিক সাহিত্য পত্রিকা থেকে বারংবার তাগাদা পেলাম কিছু লেখা জমা দেওয়ার জন্য। কিন্তু কি যে লিখি… ক’দিন ধরে ভেবেও কোন প্লট এল না মাথায়। এদিকে সংগীত বড় পছন্দের বিষয়। এলোমেলো ভাবনা এলেই মনকে একত্রিত করতে গানের খাতা নিয়ে বসা আমার পুরোনো অভ্যাস। সেই ভাবেই পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটি শব্দে এসে চোখটা আটকে গেল হঠাৎ। তিথি…. আমার মনের মণিকোঠায় জ্বলজ্বল করে উঠল একটি করুন কাহিনী।
আজ থেকে প্রায় ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা বলছি। তখন না ছিল মোবাইল, না ইন্টারনেট, এমনকি টিভিও ছিল কালে ভদ্রে সামান্য কিছু পরিবারে, তা ও ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। সেই সাদা কালোর যুগে রঙীন ছিল মানুষের মন আর সহজ ব্যবহারের আন্তরিকতা। কিন্তু তার মধ্যেও ছিল প্রেম, ভালবাসা, হিংসা দ্বেষ… বেশ কিছু জায়গা জুড়েই বিরাজমান।
এমনই এক মানুষের কথা আজ বলব। সে ছিল আমার ছোটপিসি বুলার কলেজের বান্ধবী, তিথি।
তিথিপিসিকে আজ আর আমার স্পষ্ট মনে নেই, তবে পিসির জীবনের একটা অভাবিত ঘটনা সে সময় নাড়া দিয়ে গিয়েছিল আমার বয়ঃসন্ধির কচি মনকে। সাদাকালোয় মোড়া জীবন ছিল তখন, তার মধ্যেও তিথিপিসির পালতোলা রঙীন মন পানসি চালিয়েছিল আমার মনের অন্দরেও।
ফ্ল্যাশব্যাক :
লোক্যাল ট্রেন থেকে নেমে জোরে জোরে পা চালাল তিথি। ইসসস কত দেরি হয়ে গেল, ম্যাথস অনার্সের প্রথম ক্লাসটায় আর বোধহয় পৌঁছনো গেল না। অবধারিত লেট আজ। প্রফেসর সত্যেন সেনগুপ্তের একনিষ্ঠ ছাত্রী, অংক ছাড়াও ডিবেট, লিটারেচার সবেতেই তুখোড় তিথি রায়চৌধুরী কলেজ ইলেকশনে এস.এফ.আই ক্যান্ডিডেট হিসেবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে চলতি বছরের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল সেক্রেটারি। কত কাজ ছড়িয়ে চারিদিকে। জি এস দাদার সাথে মিলেমিশে স্টুডেন্টস দের বক্তব্য শোনা, দুস্থ মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের অনার্স এর সিট পাইয়ে দেওয়া, নতুন ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভদের তৈরী করা, পার্টি মনস্ক করা…ইত্যাদি ইত্যাদি।
রাজনীতি তার রক্তে। জ্ঞান হওয়া থেকেই দেখে আসছে ছোড়দার ঘরে পার্টির ইস্তাহার। মার্কস, লেনিন, মাও সে তুঙ্ এর ছবি। দাদার বন্ধুরা গোল হয়ে যখন শপথ নিত শ্রেণী সংগ্রাম বিহীন নতুন পৃথিবী গড়ার, যেখানে সবাই এক…সে স্বপ্নে কখন যেন সামিল হত সে…ও। সেই আদর্শ, সেই স্বপ্ন… যেখানে থাকবেনা বুর্জোয়া রাজনীতি, ছাত্রী অবস্থায় সেই আদর্শকে বুকে জড়িয়ে আগামীর পথ চলা।
শুধু এইই তো জীবনাদর্শ হওয়া উচিৎ, ভাবে তিথি। কিন্তু এই আদর্শ চ্যুত হওয়ার মত যথেষ্ট নেতিবাচক ভাবনা উড়িয়ে নেয় তিথিকে আজকাল। লক্ষ্য করছে কমাস ধরেই তাকে নিয়ে ফার্সট ইয়ারের অনীকের বাড়াবাড়ি। অনীকও ছাত্র সংসদে যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। এ হেন দায়িত্বশীল ছেলের কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ যথেষ্ট ভাবিয়ে তুলছে তাকে ভিতরে ভিতরে। যখন তখন মিটিং এর অছিলায় ক্যান্টিনে ডেকে পাঠানো, অথবা সবার মধ্যে আলাদা করে তিথিকে জরিপ করা…সংসদের অফিসে তিথিকে নিয়ে অকারণ পজেসিভ কথাবার্তা…. ইতিমধ্যেই দলের অনেকেরই বিরক্তির কারণ হল অনীক। বন্ধুরা তো খুল্লাম খুল্লা খিল্লি করছে, আর মরমে মরে যাচ্ছে স্বয়ং তিথি। কিভাবে বোঝায় ইডিয়টটাকে যে তার স্টেডি বয়ফ্রেন্ড ইউনিভারসিটির দেবপ্রিয় জানতে পারলে আস্ত রাখবে না তিথিকে, আর তার সাথে অনীকও মরবে। তিথি কী প্রেমে পড়ল অনীকের! নাহ, তাও তো নয়, কিন্তু কেমন যেন মায়াময় ছেলেটি। তাই কী দুর্বল হয়ে পড়ছে সে ! তার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট ছেলেটির প্রতি মনে মনে সে বেশ কনসার্ন্ড। দু একবার পাশাপাশি সিনেমা হলে পরস্পরের হাতে হাত, আবার কখনো সখনো পড়া বুঝিয়ে দেবার ছলে অনীকের মায়ের হাসপাতালের ফাঁকা কোয়াটার্সে এক আধটা চুমু টুমু, তাইতেই স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে বোকা ছেলেটা। তাই তো সেদিন তুমুল ঝগড়ার মাঝে তার প্রতি দেবপ্রিয়র অধিকার বোধ সাফ জানিয়ে দিল তিথি। তারপরে এক সপ্তাহ জ্বরের ঘোরে পড়েছিল সে। আজ আর জ্বর নেই। দুর্বল শরীরে ‘যাই কলেজ ঘুরেই আসি’ মাকে এই বলে বেরিয়েছে বাড়ির থেকে।
কলেজ মোড়ের কাছাকাছি আসতেই চিন্তায় ছেদ পড়ল, দূর থেকে ছুটে আসছে ফার্সট ইয়ারের শুভাশিস আর তপনজ্যোতি।
-সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে, তিথিদি…শিগগির অনীকের বাড়ি যাও।
– তোরা এত হাঁপাচ্ছিস ? কি হল হঠাৎ ?
– পুলিশ…. বলেই তীর বেগে গলিপথে মিলিয়ে গেল ওরা।
তিথির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল, একি শুনছে সে ! গতরাতেও তো স্বপ্নে দেখা দিয়েছে অনীক, একমুখ ভালবাসা ভরা হাসি নিয়ে, জ্বরের ঘোরে যেন শুনছে ‘তোকে আমি আমার করে পেতে চাই রে, আসমানা’! তুই হবি তো আমার ?’ ফার্সট ইয়ারের এই পুঁচকে ছেলেটার কি আস্পর্ধা! ভাবতেই হেসে ফ্যালে তিথি ?
কিন্তু আজ কি হল ? পুলিশ কেন ? সে কি একটু বেশি প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছে অনীক কে ? তিথির কপালে চিন্তার ভাঁজ! ছেলেটা আবার কিছু করে বসল না তো! যা অভিমানী ! এস.এস.এর ক্লাস উঠল মাথায়। প্রচণ্ড আশংকায় দুরু দুরু বুকে তিথি চলল অনীকের বাড়ি।
কাছাকাছি আসতেই পা দুটো যেন গেঁথে গেল মাটির সাথে। এ..কি দেখছে সে? পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ, অনীকের বাড়ি ঘিরে। সঙ্গে তারই কলেজের বিভিন্ন ইয়ারের ছেলেমেয়েরা জায়গায় জায়গায় জটলা পাকিয়েছে। হঠাৎ তার চোখ গেল থার্ড ইয়ারের শমিতার দিকে। কাছে এগোতেই শমিতা একছুটে তিথিকে প্রায় ধাক্কা দিয়েই ঢুকিয়ে নিল পাশের কানা গলিতে।
– কি হয়েছে রে ? এমন করছিস কেন ? অনীক কোথায় ?
– জানিস না ? না ? ন্যাকা ? ওরে অনীক যে আর নেইই প্রায় ! আজ ভোররাতে বাগানের কুয়োয় ঝাঁপ দিয়েছে অনীক !
তিথির পায়ের পাতা দুটো পেরেক দিয়ে মাটিতে ঠুকে দিল যেন কেউ !
– কুয়োর পাড়ে রেখে গেছে তোদের দুইজনের একটা যুগল ছবি, পেছনে লেখা ‘আসমানা কে’! ছবির আসমানাটা যে তুই, তা বুঝতে বোধ হয় আর কারো অসুবিধে নেই ! বল ??? কেন এমন করলি রে তিথি ? ছেলেটাকে একেবারে শেষ করে দিলি ?
– ছবিতে সিঁদূর পরা সেই আসমানাকে পুলিশ কিন্তু খুঁজছে। এর পরেও তুই ওখানে যেতে চাস তিথি ?
– কিন্তু… কি…ন্তু এইভাবে পালিয়ে যাব ? আমার…আমার কি দোষ বলতে পারিস ?
হাউ হাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়া শরীরটা দেখে শমিতার মনে হল… পারবে তো…? পারবে তো মেয়েটা এই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে ? যে একটা বছর আর বাকি আছে ওর এই কলেজে, বন্ধুদের ঘৃণার দৃষ্টি সহ্য করে বেরিয়ে আসা কি এতই সহজ ? নাহ, শমিতার কথায় কান না দিয়ে ছুটে চলল তিথি তার প্রাণ প্রিয় অনীককে বাঁচাতে, হাসপাতালের বেডে, যেখানে শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে আজ ও। সংগে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, কারোর কোন কথাতেই আর আমল না দেবার। পুলিশ প্রসাশন, অনীকের মা, এমন কি নিজের ছোড়দাভাইও সরিয়ে আনতে পারেনি তাকে অনীকের বেডের সামনে থেকে। নাহ্ কাঁদেনি তিথি, একটুও না, শক্ত হাতে দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে গেছে সামাজিক গঞ্জনার বিরূদ্ধে, অনীককে সুস্থ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আনতেই ছ’ মাস প্রায় কাবার। ফাইনাল পরীক্ষা এক্কেবারে দোরগোড়ায়। পরীক্ষার সাথে নো কম্প্রোমাইস, সব্বাইকে অবাক করে দিয়ে নোটিশ বোর্ডে জ্বলজ্বল করে শোভা পাচ্ছে তিথি রায়চৌধুরীর ফার্স্টক্লাস।
নাহ্, পারেনি তিথি, পারেনি কলেজে টিঁকতে আর! দুটি চিঠি এসেছিল শমিতার ঠিকানায়, যথাক্রমে দেবপ্রিয় আর অনীকের নামে… দুইজনকেই শেষ বিদায় জানিয়ে জনারণ্যে মিশে গিয়েছিল তিথি রায়চৌধুরী।
তিথি পিসির সাথে আর দেখা হয়ছিল কিনা, সেকথায় পরে আসছি। তবে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করত মেধাবী এই ছাত্রীটির মেধার পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল শেষে ? পসেসিভ দেবপ্রিয় কি সঙ্গে ছিল পিসির এই অসম লড়াইয়ে না দু বছরের ছোট অনীক পেতে দিয়েছিল তার কাঁধ বয়সকালের ক্লান্ত মানুষটার দিকে ?
এখন সোস্যাল নেট ওয়ার্কিং এর যুগে প্রেম, ভালবাসা, আত্মহত্যা, শারীরিক মিলন যেন জলভাত! কিন্তু এসব এত সহজলভ্য ছিল না সেই যুগে। অনেক টানাপোড়েন এর মধ্য দিয়ে চলত সম্পর্ক এর কাঁটাছেঁড়া।
যাই হোক, আমার গল্পটির শেষ পর্য্যায়ে এসে পৌঁছেছি প্রায়। গল্পটি তো যথাসময়ে পৌঁছে গেল পত্রিকার দপ্তরে। দুরু দুরু বক্ষে অপেক্ষা করছি, গল্পটি মনোনীত হল কি হল না! হঠাৎ একদিন মেসেঞ্জারে জরুরি তলব, উক্ত পত্রিকাটির অফিস থেকে, ডেকে পাঠিয়েছেন স্বয়ং ম্যানেজিং ডিরেক্টর। যা হোক, গেলাম একদিন, স্যুইং ডোর ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই বিশাল সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ও প্রান্ত থেকে আমায় বসতে বললেন একজন প্রৌঢ়া অভিজাত মহিলা। সামনে চেয়ার ঠেলে বসতেই দেখি কাঁচাপাকা চুল, সরু পাড়ের শাড়ি পরিহিতা, হাতে চওড়া ব্যান্ডের দামী ঘড়ি, অত্যন্ত অভিজাত এক ভদ্রমহিলা আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন। বুঝলাম ইনিই ম্যানেজিং ডিরেক্টর, কিন্তু হাসির কারণ ঠিক বোধগম্য হল না। সুললিত কণ্ঠস্বর শুনলাম ” কিইই চেনা যাচ্ছে আমায় ?” আমি তো হতবাক, বলেন কি ভদ্রমহিলা ? বিস্ময়ের ঘোর কাটল যখন উনি বলে উঠলেন, “চিনতে পারলে না তো, তোমার গল্পের নায়িকাকে এখনো ? হুম ঠিক ই ধরেছ, আমিই সেই তিথি রায়চৌধুরী”। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম আমার সেই তিথিপিসির দিকে, আর তার সিঁদূর বিহীন উজ্জ্বল সিঁথি আজো অমলিন… চিরন্তনী নারী ব্যক্তিত্বের প্রতীক। পৃথিবী টা যে গোল, আর সেই বৃত্তের একেকটি প্রান্তে একেকটি মানুষ… মিলিয়ে দেবার ইচ্ছে থাকলে বিধাতা বোধকরি কার্পণ্য করেন না, প্রমাণ হল আর একবার।