কস্তুরী সেনগুপ্ত
আমি ইন্দু। এছাড়াও আমাকে তোমরা শশী, শশাঙ্ক, সুধাকর, সুধাংশু, সোম— এমন অনেক নামে ডেকে থাকো। চিনতে পারছ আমায়?
আমার ডাক নাম ‘চাঁদ’। তোমরা সবাই আমাকে এই নামে চেনো আর ভালোবাসো। আকাশে যখন পশ্চিমদিগন্তে সোনার আভায় সূর্যান্ত হয়, তখনই রুপোর মতো আলোকিত হয়ে আমার উদয় হয়। আমি অনুভব করি, তোমরা আমাকে খুব স্নেহ করো। তোমরা যারা কবি-সাহিত্যিক, তোমরা আমাকে কতভাবেই-না পরিচয় করিয়েছো, তোমাদের সৃজনশীল লেখায়। তবে চুপিচুপি বলি, আমার ভানুদাদার সঙ্গেই কিন্তু মনের মিল বেশি। আমার ভানুদাদা কে জানো? তোমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার বিভিন্ন লেখায়, চিঠিপত্রে— আমাকে কী সুন্দরভাবেই-না বর্ণনা করেছে। আর আমাকে নিয়ে কত গান বেধেছে আমার ভানুদাদা!
তোমরা মনে-মনে হয়তো ভাবো, সূর্যের মতো একইরকমভাবে সবসময়ে আমাকে আকাশজুড়ে দেখা যায় না কেন। আসলে, আমার নামের মতো, আমার রূপও অনেকরকম। যখন আমাকে সম্পূর্ণরূপে পূর্ণিমাতে দেখতে পাও আর আমার জোৎস্না ধারায় তোমরা অবগাহন করো, তখন তোমাদের দেখে আমিও বড় আহ্লাদিত হই।
ভানুদাদা তার চিঠিপত্রে কীভাবে আমাকে উল্লেখ করেছে, তার দু-একটা চিঠি শুনলেই তোমরা বুঝবে। কার্তিক মাসের ৩ তারিখে এক সোমবার ছিল কোজাগর পূর্ণিমা। ভানুদাদা বাংলাদেশের শিলাইদহে সেদিন নদীর ধারে ধীরে-ধীরে বেড়াচ্ছিল। সে দেখল, নদীতে একটি রেখামাত্র নেই। ও-ই সেই চরের পরপারে যেখানে পদ্মার জলের শেষ প্রান্ত দেখা যাচ্ছে, সেখান থেকে নদীর যে-পাড়ে ভানুদাদা দাঁড়িয়েছিল, সেই পর্যন্ত একটি প্রশস্ত জোৎস্নারেখা ঝিক-ঝিক করছে। কোথাও কোনও লোক নেই, নৌকো নেই, তৃণ নেই, গাছ নেই— তাই হয়তো ভানুদাদার মনে হয়েছে, যেন একটি উজাড় পৃথিবীর ওপর একটা উদাসীন চাঁদের উদয় হয়েছে। আমার এহেন সৌন্দর্য, ভানুদাদার মনে এমন বিষণ্ণতা সৃষ্টি করল কেন, তোমরা জানো ?
আর একদিনের কথা বলি। সেদিন আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। কারণটা জানাচ্ছি। তখন আমার শুক্লপক্ষ চলছে। আমার জোৎস্নার আলোয় চারিদিক স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। শিলাইদহে ভানুদাদা সেদিন আমার সেই জোৎস্না দেখে মনের মধ্যে কতশত ভাবানার জাল বুনছিল। আমার ভানুদাদা তো শুধু কবি নয়, দার্শনিকও বটে। তাই, তার মনের গভীর তল খুঁজে পাওয়া চারটিখানি কথা নয়। কিন্তু সেদিন আমি অনুভব করেছিলাম, সেই স্নিগ্ধ রাত্রি ভানুদাদার রোমে-রোমে প্রবেশ করে তার উত্তাপ জুড়িয়ে দিচ্ছিল। সে, প্রতিক্ষণে, প্রতিমুহূর্তে অনুভব করছিল, তার চুলের মধ্যে আমার কোমল অঙ্গুলির স্পর্শ।
মাঝেমাঝে কিন্তু আমার অভিমানও হয় তোমাদের সকলের পরে। ভানুদাদা একমাত্র আছে, যে, আমার মনের কথা সবথেকে বেশি বোঝে। তাই শিলাইদহ থেকে, একটি চিঠিতে আমাকে নিয়ে তিনি লিখেছিল, “আজ পূর্ণিমা রাত। ঠিক আমার বাঁদিকের খোলা জানলার উপর, একটা মস্ত চাঁদ উঠে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে; বোধহয় দেখছে, আমি চিঠিতে তার সম্বন্ধে কোনও নিন্দে করছি কি না। সে হয়তো মনে করে, তার জোৎস্নার চেয়ে তার কলঙ্কের কথা নিয়েই পৃথিবীর লোক বেশি কানাকানি করে”।
দেখছো তো, আমার মনের কথা কী সুন্দর ব্যক্ত করেছে আমার ভানুদাদা! তোমরা আমাকে ভালোবাসো— আমি তা জানি। কিন্তু, আমার যে ‘কলঙ্ক’ আছে, তা বারবার আমাকে মনে করিয়েও দাও— তোমাদের কাছে আমার একান্ত মিনতি রইল— আমার শুধু আলোর দিকটাই রেখো তোমাদের মনে— অন্ধকারটুকু না-হয় থাক আমার কাছে।
অনেকক্ষণ ধরে গল্প করলাম তোমাদের সঙ্গে, এখন আমি বিদায় নিই তাহলে? আবার আমি আসব, ভানুদাদার কথা নিয়ে, কবিতা নিয়ে, গান নিয়ে। তোমরা ভালো থেকো আর আমাকে ভালোবেসো।