ওঙ্কার ডেস্ক: কেরালার উপকূলে অবস্থিত ভিঝিঞ্জাম আন্তর্জাতিক বন্দর ঘিরে বর্তমানে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা শুধু ভারতের বন্দর ব্যবস্থার নয়, গোটা বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহের দিকেই নতুন করে নজর ঘুরিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে অস্থিরতা বাড়তে থাকায় এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী অঞ্চলে উত্তেজনার জেরে বহু কার্গো জাহাজ তাদের নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারছে না। ফলে বিকল্প নিরাপদ বন্দর হিসেবে উঠে এসেছে ভারতের এই নতুন গভীর সমুদ্রবন্দর।
বর্তমানে একাধিক আন্তর্জাতিক কার্গো জাহাজ, যার মধ্যে বিশাল আকারের মাদার ভেসেলও রয়েছে, ভিঝিঞ্জাম বন্দরে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করছে। জাহাজগুলির অধিকাংশই পশ্চিম এশিয়ার বন্দর, বিশেষ করে দুবাই বা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত আশঙ্কার কারণে সেই রুটে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জাহাজগুলি পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে ভিঝিঞ্জাম বন্দরের সামনে কার্যত জাহাজের লম্বা সারি তৈরি হয়েছে।
ভিঝিঞ্জাম বন্দরের অন্যতম বড় শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান। আন্তর্জাতিক পূর্ব-পশ্চিম শিপিং রুটের একেবারে কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় বড় জাহাজগুলিকে অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হয় না। পাশাপাশি, এই বন্দরের প্রাকৃতিক গভীরতা অনেক বেশি হওয়ায় বড় ড্রাফটের জাহাজও সহজে ভিড়তে পারে। ফলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে গড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য কলম্বো বন্দর বা সিঙ্গাপুর বন্দর-এর উপর নির্ভর করতে হয়েছে, কিন্তু ভিঝিঞ্জাম সেই নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে।
এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষকে একদিকে যেমন বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে, তেমনই এটি একটি বড় সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বন্দরটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জাহাজ হ্যান্ডল করে নতুন রেকর্ড গড়েছে। ক্রমশ পরিষেবা সম্প্রসারণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে আরও বেশি আন্তর্জাতিক জাহাজ এখানে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি ভারতের সামুদ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশ সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়, এবং সেই ব্যবস্থায় যে কোনও ধরনের ব্যাঘাত বিকল্প রুট ও বন্দরের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। ভিঝিঞ্জাম সেই প্রেক্ষাপটে দ্রুত নিজের জায়গা তৈরি করছে। যদি এই প্রবণতা বজায় থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে পরিণত হতে পারে। তবে এই সুযোগের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। হঠাৎ করে বিপুল সংখ্যক জাহাজের চাপ সামলাতে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, দ্রুত কার্গো হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং লজিস্টিক সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি।