অসীম সেন
পর্ব-১
প্রফেসর বাগচিঃ বারবার বলা সত্ত্বেও আমার কফিটা কেন এত পানসে করা হয় ? জানতে পারি কি ?
নাড়ুঃ আমায় চেঁচাচ্ছো কেন? বউদি বলেছে তোমাকে চিনি না দিতে।
প্রফেসর বাগচিঃ কৌন বৌদি। তুম মাইনে কার কাছ থেকে পাতা হ্যায়? এরপর দুর কর দিলে ? বৌদি বাঁচাবে। ব্যাটা উল্লুক, হিপোপটেমাস। সকালকা কফি বিগড়ে দিয়া।
সমিতা বাগচিঃ কী হল কি ? সকাল বেলায় সাত পাড়া মাথায় তুলছো কেন ?
প্রফেসর বাগচিঃ রোজ রোজ বলছি তবুও নাড়ু ব্যাটা আমাকে চিনি ছাড়া কফি দিচ্ছে।
সমিতা বাগচিঃ বেশ করেছে। আমি বলেছি। ফাস্টিং দু’শর ওপরে। চিনি খেতে লজ্জা করে না ধেরে খোকা।
প্রফেসর বাগচিঃ অ্যাই বিলো দ্য বেল্ট হিট করবে না। ধেড়ে খোকা মানে কি ?
সমিতা বাগচিঃ তা তোমার মা তোমাকে খোকা বলেন না ?
প্রফেসর বাগচিঃ মা বলেন তো? তোমার রাইট জন্মায় কী করে ?
সমিতা বাগচিঃ ও বাবা ভারি রাইট দেখাচ্ছ ? নিজের হাতে জল গড়িয়ে খেতে পারে না ধেরে খোকা।
প্রফেসর বাগচিঃ মানে ?
সমিতা বাগচিঃ (মুচকি হেসে) বাদ দাও
এই যে ডাইনিং রুমে কুরুক্ষেত্র দেখছেন। এনারা দুজন হলেন প্রফেসর গোলক বিহারী বাগচি। শর্টকাটে জিবিবি। কেমেস্ট্রির প্রফেসর দু বছর হল রিটায়ার করেছেন। আর ওনার সহধর্মীনি সমিতা বাগচি ইতিহাসের প্রফেসর। ওনার চাকরি অবশ্য এখনও বছর পাঁচেক আছে। ও একটা কথা বলা হয়নি। প্রফেসর বাগচি আদ্যপান্ত একজন ফুডি মানুষ। ডিস্টার্বেন্স চান না। তাই জীবন থেকে মোবাইল বাদ দিয়েছেন। ভরসা ল্যান্ড ফোন।
প্রফেসর বাগচিঃ দিন দিন সব কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। পেপার খুললেই শুধু খারাপ খবর। কিগো নাড়ুকে বলে দাও আজ বাজার থেকে একটু ভেটকি আর কচি পাঠা আনতে। অনেক দিনে ভালো মন্দ খাইনি।
সমিতাঃ খাইনি মানে এই তো পরশু মান্তু কাকিমার নাতনির বিয়েতে খেয়ে এলে। রবিবার এলেই শুধু খাই খাই। বয়স বাড়ছে খেয়াল থাকে না কেন ?
প্রফেসর বাগচিঃ বয়স মাই ফুট
এমন সময় ভিতরে ঢুকে এলেন একজন পুলিশ অফিসার।
প্রফেসর বাগচিঃ এই রে শালাটা আবার এসেছে
সমিতাঃ আবার মুখ খারাপ করছ ?
প্রফেসর বাগচিঃ যাঃ বাবা। শালাকে শালা বলতে পারব না !
ভদ্রলোকের নাম অসীম সেন লালবাজারের উঁচু পদের পুলিশ কর্তা। সম্পর্কে সমিতা বাগচির মাসতুতো ভাই।
প্রফেসর বাগচিঃ কী ব্যাপার হে স্বামী অসীমানন্দ ? রবিবারের ছুটিটা মাটি করতে এসেছ বলে মনে হচ্ছে
অসীমঃ আর বলবেন না জামাইবাবু। একটা ছ’ ইঞ্চির বুদ্ধ মূর্তি। জীবনটা একেবারে হেল করে দিল মাইরি।
প্রফেসর বাগচিঃ এই তোমার এক দোষ অসীম। কিছু কথা পেটে আর কিছু কথা মুখে রেখে কথা বল।
অসীমঃ শিল্পপতি এস ত্রিপাঠীর নাম শুনেছেন নিশ্চই। ওনার বাড়ি থেকে চুরি গিয়েছে এই বুদ্ধ মূর্তিটি। গোটাটাই সোনার। তার মধ্যে হিরে চুনী পান্না বসানো।
প্রফেসর বাগচিঃ অর্ধেক বাঙালি বলার তোড়ে বলে ফেলে হিরে চুনী পান্না। পান্নার দাম সাধারণত এমন কিছু আহামরি নয়। বাকিদের গোত্রে না ফেলাই ভালো।
অসীমঃ মূর্তিটির দাম শুধু সোনা হিরে পান্নার জন্য নয়। মূর্তিটি ধর্মকীর্তি নামে এক বৌদ্ধ দার্শনিকের ছিল।
সমিতা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে
সমিতাঃ ও বাবা সে তো প্রায় সপ্তম শতাব্দীর কথা।
প্রফেসর বাগচিঃ তুমি জানো এই ধর্মকীর্তিকে
সমিতাঃ গোটা দিন অ্যাসিড আর ক্ষার নিয়ে না পড়ে থাকলেই জানা যায়। ধর্মকীর্তি আসলে ছিলেন চোল সাম্রাজ্যের তিরুমলৈ গ্রামের এক ব্রাহ্মণ সন্তান। প্রথম দিকে রীতি অনুসারে বেদ উপনিষদ পাঠ করেন। অসম্ভব পণ্ডিত ব্যক্তি। পরে নাগার্জুন, বসুবন্ধুর মত বৌদ্ধ পণ্ডিতদের দর্শন পাঠ করে প্রভাবিত হন। ফল হয় মারাত্মক। ব্রাহ্মণ সমাজ তাঁকে পরিত্যাগ করেন। এরপরে তিনি চলে আসেন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিহারের প্রধান ধর্মপালের কাছে শিষ্যত্ব লাভ করেন।
প্রফেসর বাগচিঃ তা বৌদ্ধ পণ্ডিতরা তো ভিক্ষুক ছিলেন। তা ধর্মকীর্তির কাছে এত দামী মূর্তি এল কী করে ?
অসীমঃ সে তথ্য খুব একটা পরিস্কার নয়। কাশ্মীরের সঙ্গে যোগ ছিল ধর্মকীর্তির। কাশ্মীরের রাজাই বোধহয় তাঁকে এই উপহারটা দিয়েছিলেন।
সমিতাঃ হুঃ কাশ্মীর থেকে ধর্মকীর্তির একটা ব্যকরণের ওপর পুঁথি পাওয়া গিয়েছিল বটে।
প্রফেসর বাগচিঃ চোল সময় মানে সে তো বহুদিনের পুরানো।
সমিতাঃ তা তেরশ বছরের পুরানো তো বটেই।
প্রফেসর বাগচিঃ বাপরে বাপ। এতো অমূল্য অসীম।