অসীম সেন
সবে মাত্র দুপুরে এক থালা ভাত পুটিমাছের ঝাল দিয়ে খেয়ে ঘুম লাগিয়েছিলেন কমলাকান্ত। আফিমের গুলি পেটে গিয়ে কেমিকেল লোচা তৈরি করছে। প্রসন্ন গোয়ালার এক জামবাটি দুধ হাতে ধরা। হঠাৎ আওয়াজ এল মিঁয়াও। চোখের সামনে সেই বদ মার্জার। ওয়াটারলুর যুদ্ধ থেকে হুতুম প্যাঁচার নকশা সব নিয়েই বক্কানি ঝেড়ে চলে।
এ ব্যাটাকে কব্জা করার থেকে প্রসন্নকে দুটো কথা শোনানো সহজ। গম্ভীর ভাবে মার্জার বলল, সৌরভ গাঙ্গুলীর গেঞ্জি ওড়ানো, দুর্গাপুজোয় রাস্তার ফার্স্টফুড, বিশ্বকর্মায় পাড়ার মোড়ে মোড়ে নাগিন ড্যান্স আর বৃষ্টি হলে তিলোত্তমায় কোমর জল। কয়েকটি বিষয় আমাদের ট্রেড মার্ক। কলকাতার একান্ত নিজস্ব। আর রইল রাজনীতি। মহারাষ্ট্র, গোবলয়, দাক্ষিণাত্য, এমন রাজনীতি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। অতীত থেকে বর্তমান কখনও সৌজন্য সীমার মধ্যে থেকে বিরোধিতা। কোথাও বা সৌজন্য ভাসিয়ে দেওয়া হয় গঙ্গায়।
কমলাকান্ত নিতান্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, সৌজন্য গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়, মানে? বিধান সভার ভিতরে জ্যোতি বসু আর বিধান রায়ের বৈরিতা একটি মাইলস্টোন হয়ে থাকলেও। দুজনের মধ্যে অলিখিত চুক্তি ছিল নির্বাচনের সময় তাঁরা কেউ কারও নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে জনসভা বা প্রচার করবেন না। ১৯৫২ সালের সাধারণ নির্বাচন ছাড়া আর কখনও কেউ এই চুক্তি ভাঙেননি। ট্রামভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে বামেদের মিছিলে যাচ্ছিলেন জ্যোতি বসু। উল্টো পথে বিধান রায়ের গাড়ি। বিধান রায় জ্যোতি বাবুকে বলেছিলেন তাঁর থেকে লুচিতে ভাগ বসাতে। খালি পেটে লড়াই হয় না।
মার্জার বলল, শুনতে ভালো, বলতে আরও ভালো। কমলাকান্ত বুঝলেন তাঁর লেগপুল করা হচ্ছে। তিনি গলার আওয়াজ বাড়িয়ে বললেন, শোনা যায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কাজের সূত্রে দিল্লি গেলে অনেক সময়ই লালকৃষ্ণ আদবানীর বাসভবনে মধ্যাহ্নভোজ সারতেন। কয়েক দশক আগেও ভোট প্রচারে লেখা দেওয়ালে লেখা হত বঙ্গবাসী সাবধান, এসেছেন গণিখান হাতে নিয়ে স্টেনগান। অথচ জ্যোতি-গণিকে তখন রাজনীতির অন্দরমহলে অনেকেই মজা করে জয়-বীরু ডাকত। জ্যোতি বসুর জন্য নিয়ম করে বিরিয়ানি আসত গণিখানের বাড়ি থেকে।
কেন মিছে জোব চার্নকের আমলের গল্পকথা আউড়িয়ে যাচ্ছেন, নিজের গোঁফ তা দিয়ে বলল বকাটে বিড়াল। আজকের প্রেক্ষিতে এ সবই গল্প, গুড ফর নাথিং। এই তো কিছুদিন আগে তৃণমূল সেনাপতি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে খুল্লামখুল্লা কটাক্ষ করলেন। এটা কি রাজনৈতিক সৌজন্য ? ডিজে বাজাতে চাইলেন ভোট ফলের পর। এটাকি ভদ্দর লোকের কথা ? তারপরেই আবার ডিম থেরাপি চলল, সেটাও কি সুস্থ রাজনীতি ? আসলে বেজায় হোঁচট খাচ্ছে রাজনৈতিক সৌজন্য। বাংলা নিজের মেয়েকে চায় বলে কীর্তন গাওয়ার পরেই গোটা বাংলা চলে গেল কর্পোরেট গোত্রের এক কোম্পানির হাতে। এখন বাংলার রাজনীতিতে শুধুই বৈরিতা। ভীমের গদা আন অথেনটিক ভাবে খুঁজে চলেছে দুর্যোধনের উরু। জানলার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলোটা এসে পড়ছে কমলাকান্তের মুখে। নেশা চটকে যেতে বসেছে। নেহাতই অসহায় ভাবে মার্জারকে জিজ্ঞাসা করলেন, অতঃ কিম ? মার্জার লেজ ঝাপটে বললে ঘোড়ার ডিম।