অসীম সেন:
কতটা আবেগ পেলে উত্তম হওয়া যায় ? টালিগঞ্জের ভিড়টা আজ চোখে সওয়া ভিড় নয় মোটেই। রোগা মানুষটা চোখের ইশারায় তাঁর বান্ধবীকে বলছেন, আমাকে একবার বলো উত্তমকুমার। আজ বাইক চালাতে চালাতে বাদশার গান মুছে গিয়ে গুন গুন করতে ইচ্ছে করে এই পথ যদি না শেষ হয়। রবিবারে রেওয়াজি খাশি খাওয়ার পরে তৃপ্তির ঢেকুর বোধহয় উত্তমকুমার।
প্রলেতারিয়েত প্রেমিক যখন জুটমিল খোলার দাবিতে মিছিল করে, তখন তার মধ্যেই ফুটে ওঠে উত্তমকুমার। নেপালের হড়পা বাণের পর উদ্ধার পাওয়া দু বছরের শিশুটার ঠোঁটে হাসিটার মধ্যে লুকিয়ে থাকে উত্তমকুমার। জীবনের ঝলমলে দিকটায় মহানায়ককে দেখে অভ্যস্ত আজকের প্রজন্ম হয়ত জানেই না, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিই তাঁর নাম দিয়েছিল ফ্লপ মাস্টার জেনারেল। সাড়ে চুয়াত্তর দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো। এরপর অগ্নিপরীক্ষা, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, সপ্তপদী এক একটা নাম, আর তখনকার ফিল্ম ম্যাগাজিনে অ্যাঙ্গুলার ফেসিয়াল পোজে মহানায়কের থ্রি কোয়ারটার প্রোফাইল ছবি।
তখনকার দিনে সদ্য কিশোরি থেকে মাঝবয়সী, সকলের কমন প্রেমিক ছিলেন উত্তমকুমার। এতো গেলো আলোর দিকটা। তাঁর ড্যাজলিং রেডিয়েন্ট হাসির আড়ালে চাপা দেওয়া ট্রাজেডির নোনা জল বোধহয় থেকেই গিয়েছিল আমরণ। অসমাপ্ত আত্মজীবনী ‘আমার আমি’-তে শুরুতেই তিনি লিখেছেন, “আমার চারপাশে ঘন অন্ধকার। নিকষ কালো অন্ধকার। আমি দাঁড়িয়ে আছি। দাঁড়িয়ে আছি একটি আলোকিত বৃত্তের মাঝখানে। … আমি জানি, স্থির জানি, এই আলো, উজ্জ্বলতা কিছুই দীর্ঘস্থায়ী নয়। সেই আলো যেকোনও মুহূর্তে নিভে যেতে পারে।”
ডায়েরি লেখাটা একটা অভ্যেসের মধ্যে ছিল। শোনা যায়, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁরই ইচ্ছায় পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল সেই ডায়েরি। একশবছর আগে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় জন্মানো বাঙালির আইকন উত্তম কুমার। বাংলা সিনেমার এমন একটি কবিতা, যার পাঠে মনে প্রেম আসে, চোখে জল আসে। এমন উত্তম যা হৃদয়ে থাকে আলো হয়ে।