অর্ণব দত্ত
যন্তর-মন্তরে জেন জি প্রজন্ম গুছিয়ে এনডিএ সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছেন, “মোদিজি তুম দেশ নেহি, চায়ে বেচো”। এর আগে দেশের কোনও প্রধানমন্ত্রীকে এ ধরনের স্লোগানের মুখোমুখি হতে হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাবা চা বেচতেন। শোনা যায়, মোদি নাকি প্রথম জীবনে গুজরাত ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের ক্যান্টিনে টেবিল মুছতেন। পরে জরুরি অবস্থার সময়ে তিনি ঝোলা লেকে কোথায় যে মিলিয়ে গিয়েছিলেন ঘর-সংসার, বিবাহিত স্ত্রীকে ত্যাগ করে তা নিয়ে নানান মুনির নানা মত।
আসলে বাংলায় একটা কথা চালু আছে। জন্ম হোক, “যথাতথা কর্ম হোক বড়।“ ফলে মোদিজির বাবার চায়ের দোকানি, এটা বলে প্রধানমন্ত্রীকে অবমাননা করা আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য নয়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৫ বছর ধরে দাবি করেছিলেন, “বাংলা ঘরের মেয়েকেই চায়।” এরপর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেই ঘরের মেয়ে নিজের কেন্দ্রেই কেন পরাস্ত হলেন, তা নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন বিরোধীরা। মূল অভিযোগ হল কেন্দ্রীয় বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে ইভিএমে কারচুপি হয়েছে। যদিও বর্তমানে ভারতের ৭২ শতাংশ ভূখণ্ড শাসন করছে বিজেপি।
দেশ স্বাধীনের পরে সবচেয়ে বেশি সময় কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ছিল কংগ্রেস। আর বাংলা ৩৪ বছর শাসন করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। তারপর মমতার লাগাতার আন্দোলনের পরে সত্যিই বাংলার মানুষ “চুপচাপ ফুলে ছাপ দিয়েছিলেন।“ তৃণমূল ১৫ বছর বাংলা শাসন করে ক্ষমতা হারিয়েছে শুধু তাই নয়, মমতার পাশে তৃণমূলের টিকিটে জেতা দলীয় বিধায়ক কিংবা সাংসদদের অনেকেই নেই। প্রাক্তন মা-মাটি-মানুষের সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মাদার ডেয়ারির দুধ বিক্রি-সহ কষ্টসৃষ্টে সংসার চালাতে জীবন সংগ্রাম করেছেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্নীতি, রাহাজানির বিরুদ্ধে মানুষের মনে ক্রোধ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। বাংলায় হচ্ছে, হবে করেও শিল্পায়ন না হওয়ায় পরে মমতা কখনও সরকারি কর্মীরা বকেয়া মহার্ঘ ভাতা আদায়ের দাবি জানালে তাঁদের বলেছেন, “কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করবেন না। দরিদ্র স্বামী-স্ত্রীকে পরামর্শ দিয়েছেন, কাজ অনেক আছে। কেটলি নিয়ে ফুটপাথে একটা দোকান বানিয়ে চা বেচুন। চপ ভাজুন। তাহলেই হবে।”
এখন ব্যাপার হল ভারতে রাজনৈতিক নেতা তা শাসক কিংবা বিরোধী যারাই হোক না, তাঁদের জিভ যেন অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো লাগামহীন। যেমন, আন্না হাজারের ভাবশিষ্য আপ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পাগল বলেছিলেন। লোকসভার প্রধান বিরোধী দলের নেতা রাহুলকে বিজেপি নেতারা বলছেন, “রাহুলের সঙ্গে ভারত বিরোধী শক্তির যোগাযোগ আছে।“ এর আগে রাহুলের মা সোনিয়া গান্ধিকে বিদেশিনী বলে কটাক্ষ করেছিলেন বিজেপি তথা আরএসএস।
ব্রিটিশ আমলে এদেশে নারীশিক্ষার প্রসারে বিদেশিনীদের অবদানের তালিকা প্রলম্বিত না করে একটি নাম স্মরণ করিয়ে দেওয়া যায়। তিনি সিস্টার নিবেদিতা। মাদার টেরিজাও বিদেশিনী ছিলেন। যিনি কনভেন্টের আরাম পরিত্যাগ করে ফুটপাথের ভিখিরি, কুষ্ঠরোগীদের সেবায় জীবনভর কাজ করেছেন। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের ভারত কেমন হবে, এপ্রসঙ্গে রামকৃষ্ণ মিশনের এক বিশিষ্ট প্রবীণ মহারাজ সম্প্রতি সাফ জানিয়েছেন, “আরও সর্বনাশ হবে ভারতের।“
এপর্যন্ত সর্বনাশের হাল কোন পরিস্থিতিতে, সেসম্পর্কে কিছু সরকারি তথ্য পেশ করছি। সাধারণ ভারতীয়দের মাথার উপর ঝুলছে বিরাট মাপের ঋণের বোঝা। ২০২৭ সালে সেনসাসে পরিষ্কার হয়ে যাবে বর্তমানে ভারতের জনসংখ্যা। লোকসভায় এনডিএ সরকারের তরফে লোকসভায় লিখিতভাবে জানানো হয়েছে, “২৮ কোটি ভারতীয় নাগরিকের বকেয়া ঋণের পরিমাণ সর্বশেষ হিসেব অনুসারে, ২০১৭ সালের পর থেকে ডবল হয়েছে ডবল ইঞ্জিনের আমলে। ২০১৭-২০১৮ সালে যা ছিল ১২.৮ কোটি তা ২৮.৩ কোটিতে এসে ঠেকেছে।“ সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারের মাথার উপর ২৭০ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ ঝুলছে। সূত্রের খবর, এই ঋণ নেওয়া হয়েছে বিশ্বব্যাঙ্ক, আইএমএফ, ইন্টারন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ফর রিকনট্রাকশন অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট-সহ একাধিক সংস্থার কাছ থেকে।
সূত্রের খবর, ভারতীয় নাগরিকদের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দুই লক্ষাধিক টাকা। হাসির রাজা শিবরাম বলেছিলেন, “ধার নিতে নিতে তিনি নাকি ধারালো হয়ে গিয়েছিলেন। ভারতেরও অবস্থা এখন অনেকটা যেন তেমন খাপখোলা তলোয়ারের মতোই!”