চোর
অসীম সেন
পর্ব-১
সে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা। নারায়ণ পাকুরিয়া মুড়াইলে তখনও বিকেল থেকেই শিয়াল ডাকত। সময়টা শীতকাল। স্টেশন নামলেন এক শহুরে বাবু। গন্তব্য দরবার মেলা গ্রাম। দরবার মেলা গ্রাম তখন শুনশান। বুড়ো শিবতলায় হ্যারিকেনের আলোয় দাবা খেলছেন তালুকদার খুঁড়ো আর তারিনী বন্দ্যোপাধ্যায়। এ খেলার শুরু আছে শেষ নেই। দুই দাবাড়ুকে ঘিরে আরও পাঁচ সাত জন বৃদ্ধ। এরা প্রত্যেকেই জানেন আর কিছুক্ষণ পরে খিস্তি খেউড় থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত খেলা বানচাল হতে চলেছে। প্রতিদিন এক গল্প।
এমন সময়ে সেখানে এলেন সেই শহুরে বাবু। যাকে আমরা এর মধ্যে দেখেছি স্টেশনে। এই রাত বিরেতে একটা আস্ত শহুরে বাবু ! রীতিমত আলোচনার বিষয় বটে। পাঁচটা মানুষের দশটা প্রশ্নের উত্তরে জানা গেল ভদ্রলোকের নাম অচিন্ত বসাক। কলকাতার নামকরা খবরের কাগজে চাকরি করেন। দরবার মেলা এসেছেন গ্রাম নিয়ে লেখালেখি করবেন বলে। দরবার মেলা নিয়ে লেখালেখি ! আবার বিষম খাবার পালা। তারিনী খুঁড়োই বুদ্ধি বাতলালেন। রাতে নিখিল মাষ্টারের ঘরটা খুলে দিতে বললেন।
অনেকদিনের বন্ধ ঘর। তবে বাসযোগ্য রয়েছে এখনও। সকালে পঞ্চায়েতের সামনে গোটা গ্রামবাসীর সঙ্গে অচিন্ত বসাকের আলাপ করিয়ে দিলেন তারিনী বন্দ্যোপাধ্যায়। হাজির ছিলেন পতিতপাবন গুঁছাইত। এলাকার মাণ্যিগণ্যি মানুষ। কয়েকটা চালকলের মালিক, একটা সোনার দোকান রয়েছে। বিদ্যে তিন ঘণ্টা প্লাস। সকাল নটায় স্কুলে গিয়েছিল বেলা বারোটায় স্কুলের মাষ্টারকে গালি দিয়ে সেই যে স্কুল ছেড়েছিল আর ও মুখো হয়নি। টাকার দাপটে। এলাকার ফুটবল টিমের হোথা। লাইব্রেরি পরিচালন কমিটিরও মাথা। ‘শহরের নামকরা খবরের কাগজের সাংবাদিক’! মাখন মিশল পতিতপাবনের গলায়। বললেন, আমাদের দরবার মেলা গ্রামের আজ গর্বের দিন। আমাদের গ্রামের নাম পেপারে উঠবে। আজ থেকে অচিন্ত বাবুর সব দায়িত্ব আমি নিলাম। যতদিন তিনি আমাদের গ্রামে থাকবেন আমার কুড়ে ঘরেই থাকবেন।
অচিন্তঃ না না আমার জন্য অতটা ব্যস্ত হতে হবে না। নিখিল মাষ্টারের ঘরেই আমি ভালো আছি। বরং যদি একটু পরিস্কার করিয়ে দেওয়া যায় তাহলে সুবিধা হয়।
পতিতপাবনঃ না না ওখানে থাকতে হবে না। ভূতের বাড়ি। তাছাড়া আপনার মত বিখ্যাত একটা মানুষ ওই চোরের বাড়িতে থাকবেন ! এ তো আমাদের গ্রামের অপমান।
অচিন্ত : চোরের বাড়ি মানে ?
মুখ খুললেন গ্রামের একমাত্র হোমিওপ্যাথ ডাক্তার বিধান চক্রবর্তী।
– নিখিল বাবুর ছেলে চোর ছিল কিনা তা প্রমাণিত হয়নি পতিতপাবন বাবু। আপনিই শুধু সেদিনের ঘটনার সাক্ষ।
পতিতপাবন : তার মানে আমি কি মিথ্যে বলেছিলাম? আপনি তো বলবেনই নিখিল বাবু তো আপনার প্রাণের বন্ধু ছিলেন।
বিধান : প্রাণের বন্ধু ছিলেন কি না বলতে পারব না। তবে আমি বিশ্বাস করি নিখিল বাবুর ছেলেকে ফাঁসানো হয়েছিল। এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিলেন তারিনী বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার মুখ খুললেন, আ হা ও সব পুরানো প্রসঙ্গ এখন তোলা কেন বাপু। সবাই মিলে বলো অচিন্ত বাবুর খাওয়া দাওয়ার কী ব্যবস্থা হবে ?
বিধান : যদি কারও অসুবিধা না থাকে। অচিন্ত বাবুর খাবার দাবার না হয় এ কদিন আমার বাড়ি থেকেই যাবে। আপনার তাতে কোনও আপত্তি নেই তো অচিন্ত বাবু।
– না না অসুবিধা থাকার কী আছে। তবে আমাকে বাবু বলবেন না। আমি আপনার ছেলের বয়সী। অচিন্ত বলেই ডাকবেন।
– তাহলে আজকের দুপুরের খাবারটা আমার বাড়িতে গিয়েই খেও। সর্বমঙ্গলা স্পোর্টিং ক্লাবের পাশের একতলা বাড়িটা আমার। রাতের বেলার খাবারটা না হয় আমার মেয়ে তোমার ওখানে পৌঁছে দেবে।
দুপুর বেলায় বিধান ডাক্তারের বাড়িতে পৌঁছে গেল অচিন্ত। প্রথমবার যাচ্ছে পাড়ার মিষ্টি দোকান থেকে গোটা দশেক দানাদারও নিয়ে নিল। কিন্তু বাড়িতে ঢুকতেই চেঁচিয়ে উঠল পিয়ালী- কী ব্যাপার আপনি কাউকে কিছু না বলে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ছেন যে।
– না মানে বিধান কাকু আসতে বলেছিলেন।
– উদ্ধার করে দিয়েছেন। তা ভদ্রলোকের বাড়িতে আসলে বাইরে থেকে একবার সাড়া দিতে হয়তো নাকি ?
– আমার ভারি অন্যায় হয়ে গেছে। আমি না হয় পরে আসব।
অচিন্ত যাবার জন্য পিছনে ফিরতেই পিয়ালী বললো, হ্যাঁ চলে যান আর বাবা আমাকে উদ্ধার করুক। আপনি তো অচিন্ত বাবু ?
– হ্যাঁ। আপনি ?
– সেটা আপনার বিধান কাকার কাছ থেকেই শুনে নেবেন
ইতিমধ্যে বিধান ডাক্তার বাইরে থেকে ফিরে আসেন। অচিন্তকে দেখে ডেকে নিলেন। বললেন, আমার মেয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছে নিশ্চই ?
– আলাপ ? হ্যাঁ তা ভালোভাবেই হয়েছে।
– তা চলো ঘরে যাওয়া যাক।
খাওয়া দাওয়ার পর দাওয়ায় বসে বিধান ডাক্তার আর অচিন্ত। অচিন্তই কথা শুরু করলো- আচ্ছা কাকা পতিতপাবন বাবু সকালে কী বলছিল ? নিখিল বাবুর কথা ? প্রসঙ্গটা উড়িয়ে দিতে চাইলেন বিধান। একটু ভারী গলায় বললেন, বাদ দাও ওসব কথা। নিখিল বাবু এলাকার প্রাইমারি স্কুলের হেড মাষ্টার ছিলেন। অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। ওনার এক ছেলে ছিল। অসীম। একদিন অসীম নাকি পতিতপাবন বাবুর দোকান থেকে সোনার দুল চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। সেদিন নিখিল বাবু তার ছেলেকে বেত দিয়ে মেরে গাঁ ছাড়া করে। অপমান সহ্য করতে না পেরে সে রাতেই গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন নিখিলবাবু। সে থেকে বাড়িটা ফাঁকাই পড়ে আছে।
– এরপর কেউ খোঁজ নেয়নি তাঁর ছেলের।
– মা মরা ছেলে। বাপটাও গলায় দড়ি দিল। কে আর খোঁজ নেবে ?